২৫শে ফেব্রুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ দুপুর ১:০৮

বংশগতি বিদ্যা এবং ভগবান মনু কথিত বর্ণসংকরদের মর্যাদা♦

রিপোর্টার নাম
  • আপডেট টাইমঃ রবিবার, জানুয়ারি ১৪, ২০১৮,
  • 266 সংবাদটি পঠিক হয়েছে

লেখকঃ ভানুলাল দাস
—————————————————————
আধুনিক জীববিজ্ঞান ও জীনবিদ্যার প্রতিষ্ঠিত সত্য হল, সন্তান হল পিতা-মাতার মিলিত রক্তের সৃষ্টি। সন্তানে পিতা বা মাতার কারও ইচ্ছাকৃত গুণ-প্রাধান্য নেই। সন্তানের জৈবিক গুণাবলী দেহ-কাঠামো, মেধা, সবকিছুই পিতামাতা দু’জন থেকে আসে। কারও ভেতর মাতৃগুণ প্রাধান্য পেতে পারে, কারো বা পিতৃগুণ, বংশগতিই তা নির্দ্ধারণ করে। ঋষি মনু কিংবা দ্বিজবর্ণের পুরুষ কখনো তা নির্দ্ধারণ করতে পারে না। যেমন, তারা পারেন না ব্রাহ্মণ নারীর বংশগুণাবলী শুদ্রের ঔরসে জন্ম নেয়া সন্তানে সঞ্চালন বন্ধ করতে। বংশগতির প্রধান বাহক জীন কখনো ব্রাহ্মণ্যবাদী মনুর সূত্র মেনে চলে না। প্রতিলোম বা অনুলোম পদ্ধতিতে উৎপন্ন বর্ণসংকর মনু কথিত হীনবর্ণ বা উচ্চবর্ণ হতে পারে না। মূলত উভয়ই একই বংশ ধারাবহন করে, তাই তারা একই সৃষ্টি। তাদের মর্যাদা ও বর্ণ একই রকম হওয়া যৌক্তিক।
বংশগতি বিজ্ঞানের আলোকে বর্ণসংকরদের অবস্থান মনু কথিত অবস্থানের সঙ্গে আদৌ মিলে না। যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেয়া যায় যে, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শুদ্র, এরা ক্রমানুসারে শ্রেষ্টতর, তবু রক্ত সম্পর্ক বা বংশগতির নিয়মে অনুলোম কিংবা প্রতিলোমজাত বর্ণসংকরদের অবস্থান হবে একই বর্ণে এবং অবশ্যই একই মর্যাদার।

বংশগতির নিয়মানুসারে, মনুর অনুলোম ও প্রতিলোম বিধি অনুসারে বর্ণমর্যার্দা নির্দ্ধারণী প্রস্তাব অন্যার্য,অনুচিত ও যুক্তি বিবর্জিত। বর্ণ মানতে গেলেও শুধুমাত্র পিতামাতার লিঙ্গ বৈষম্যের কারণে সন্তান ভিন্ন ভিন্ন বর্ণ পেতে পারে না। অনুলোমে সন্তান মাতার বর্ণ আর প্রতিলোমে সন্তান মাত্রই শুদ্র বর্ণের হবে (মায়ের বর্ণ উচ্চ হলেও), এমন বিধান অবৈজ্ঞানিক ও অযৌক্তিক। এতে বর্ণবিদ্বেষ ছাড়াও পিতৃতন্ত্রের অযৌক্তিক নারীবিদ্বেষ প্রকাশ পেয়েছে।

জীনতত্ত্ব অনুসারে, পিতামাতার বর্ণের পারস্পরিক পরিবর্তন হলে সন্তানের বর্ণ ভিন্নতর হতে পারে না। আধুনিক জীব বিজ্ঞানের সূত্র মতে, যত দূরত্বের রক্ত সম্পর্কের মধ্যে মিশ্রণ হবে সন্তান হবে তত বলবান, মেধাবী আর আয়ুষ্মান। বংশজাত রোগ (জেনেটিক ডিজিজ) ও জীন বিকৃতি থেকে সন্তান পাবে অব্যাহতি। বর্ণসংকর মানুষ হিসেবে তথাকথিত দ্বিজবর্ণের চেয়ে উন্নত মানুষ।
ইউরোপ, আমেরিকায় বিভিন্ন জাতির মানুষের মিশ্রণে সৃষ্ট বর্ণসংকরদের কর্মদক্ষতা, জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চা, মেধা এ সত্য সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে আজ। অথচ হিন্দুধর্মের ধ্বজাধারীগণ অবৈজ্ঞানিক সূত্রাবলম্বন করে বর্ণসংকরদের নিকৃষ্ট জাতি ঘোষণা করেছে ধর্মের নামে। বংশগতি অনুসারে বর্ণসংকর মাতা ও বর্ণসংকর পিতার সন্তান তথাকথিত বর্ণধারীর সন্তান থেকে জৈবিকভাবে উন্নত মানুষ। অথচ মনুস্মৃতি তাদের উত্তম, অধম, মধ্যম বর্ণসংকর বলে তাদের হীনতর ঘোষণা করেছে। এভাবেই সৃষ্টি করা হয়েছে একই শুদ্রবর্ণের মধ্যে শতরকম বিভেদ,বিদ্বেষ ও অনৈক্য।

বর্ণসংকরের সামাজিক ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য :

শিক্ষা সংস্কৃতি কিংবা জ্ঞান বিজ্ঞানের উন্নতি নির্ভর করে সমাজের মানুষের মধ্যে পরস্পর মিলন, আদান প্রদান, দেয়া-নেয়ার উপর। মানুষে মানুষে যত বেশি মিলন হবে, ততই সংস্কৃতি হবে উন্নত এবং মানুষ হবে সংস্কৃতিবান। দূর্ভাগ্য, বহুকাল ধর্মশাস্ত্র বেদ, উপনিষদ, গীতা, পুরান ইত্যাদি ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণাদি দ্বিজবর্ণের অধিকারে ছিল। পঠন পাঠন শিক্ষণের মাধ্যমে তারাই শুধু বিদ্যা অর্জন করেছেন ও অগ্রসর বর্ণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শুদ্ররা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্বেও রাষ্ট্রীয় ধর্মীয় আইনের নামে তাদের বেদশিক্ষা বা কোন রকম শিক্ষা থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। সামাজিক মেলা মেশায় বাধা দেয়া হয়েছে।
খেয়াল করুন, মহামতি মনু কী বলেছেন –
(ক) ‘শুদ্রকে লেীকিক উপদেশ বা ধর্মোপদেশ দেবে না। যে ব্রাহ্মণ শুদ্রকে এমন উপদেশ দেবে সেই ব্রাহ্মণকে শুদ্রের সঙ্গে অসংবৃত নামক নরকে যেতে হবে।’ মনুসংহিতা ১০/৮০-৮১

(খ) ‘শুদ্র রাজ্যে দ্বিজগন বাস করবে না।’ মনুসংহিতা ১০/৬১

(গ) ‘একাকী শুদ্রের সঙ্গে ব্রাহ্মণ কোথাও
যাবে না।’ মনুসংহিতা ১০/১৪০

(ঘ) ‘শুদ্রান্ন ব্রহ্মতেজ নষ্ট করে।’ মনুসংহিতা ১০/২১৮

(ঙ) ‘ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য পুরুষের দ্বারা শুদ্রানীর গর্ভে জাত সন্তানের পৈতৃক সম্পত্তিতে কোন অধিকার নেই।’ মনুসংহিতা ১০/১৫৫

ধর্মের নামে এভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী শুদ্রদের অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। অর্থনৈতিক মুক্তি ও ধর্মীয় অধিকার বঞ্চিত জনগণ কোথায় পাবে শিক্ষা-দীক্ষা? আর কোথায় বা পাবে উন্নত সংস্কৃতি?

আর্যসমাজ ভারতের আদিবাসি মানুষদের উপর শোষণ চিরস্থায়ী করার জন্য তথাকথিত চর্তুবর্ণের সৃষ্টি করেছিলেন। রাষ্ট্রীয় সম্পদে একচেটিয়া অধিকার কায়েম রাখার জন্য ধর্মের নামে অধর্ম স্বরূপ বর্ণভেদ প্রচার করা হয়েছে। ব্রাত্যজন অনার্যদের তারা নিম্নতম বর্ণ শুদ্র হিসেবে অখ্যায়িত করে তাদের ধর্ম হিসেবে আর্য ত্রিবর্ণের সেবা নির্দ্ধারন করেছেন।

এমন কি হিন্দু ধর্মে শুদ্রের স্বর্গে যাওয়া বা পারমার্থিক মুক্তি লাভ হবে কি-না, তা বেদে বা পুরাণে নেই। আর্য ঋষি, কবি, অবতার , ধর্মগুরু যে সমুদয় শ্লোক, সূত্র, ধর্মপুস্তক রচনা করেছেন, লক্ষ্য করলে দেখা যাবে সবই ত্রিবর্ণ আর্য মহিমার কাহিনী। তারাই অবতার, তারাই ভগবান, তারাই মর্ত্ত্যলোকে ভগবানের স্বরূপ ইত্যাদি আখ্যানভাগে পুরানাদি ভরপুর।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ ...
© All rights Reserved © 2020
Developed By Engineerbd.net
Engineerbd-Jowfhowo
Translate »