১১ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ রাত ১:২৬

বর্ণসংকর বিষয়ে শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকুল চন্দ্র♦

রিপোর্টার নাম
  • আপডেট টাইমঃ রবিবার, জানুয়ারি ১৪, ২০১৮,
  • 848 সংবাদটি পঠিক হয়েছে

লেখকঃ ভানুলাল দাস
———————————————————–
‘সৎসঙ্গ’ নামক ধর্মীয় সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ঠাকুর শ্রী শ্রী অনুকুল চন্দ্র একজন ব্রাহ্মণ। বাংলাদেশের পাবনা জেলার হেমায়েতপুর ও ভারতের দেওঘর সৎসঙ্গীদের তীর্থস্থান। হিন্দুধর্মের সংস্কার ও ঐক্য প্রতিষ্ঠায় মুল্যবান অবদান রাখলেও দুঃখজনক হল, অনুলোম প্রতিলোম বিধান সর্ম্পকে ঠাকুর অনুকুল চন্দ্র অত্যন্ত অযৌক্তিক মতামত পোষণ করতেন। তার মতামত সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক, সংস্কার প্রসূত ও মানবতাবাদ বিরোধী এবং অবশ্যই অগ্রহণযোগ্য। তার মতামত আধুনিক জীববিজ্ঞান ও সমাজ বিজ্ঞান মোটেই সমর্থন করে না।

ঠাকুর অনুকুল চন্দ্র মনে করতেন, হিন্দু সমাজের ক্রমোন্নয়ন ও বিকাশের জন্য অনুলোম বিবাহ উত্তম পন্থা। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য তিন বর্ণের দ্বিজগণ অনুলোমক্রমে নিম্নবর্ণের নারীর গর্ভে সন্তান উৎপাদন করলে সন্তান পিতার উচ্চ সংস্কৃতি ও জৈবিক গুণাবলী প্রাপ্ত হয়ে নিম্নবর্ণের নরনারী কালক্রমে উচ্চবর্ণের মতো উন্নত মানুষে রূপান্তরিত হবে এবং একদা বর্ণ বৈষম্য দুর হবে।
কিন্তু অনুলোম বিধানমতে বর্ণসংকরজাত সন্তান মাতার হীনবর্ণ পেয়ে থাকে। তবে ঠাকুর অনুকুল চন্দ্র কথিত উচ্চবর্ণে স্থানান্তর কীভাবে সম্ভব?

‘ শুদ্রায়াং ব্রাহ্মণাজ্জাতঃ শ্রেয়সা চেৎ প্রজায়তে
অশ্রেয়ান শ্রেয়সীং জাতিং গচ্ছত্যা সপ্তমাদ্যুগাৎ।’ মনুঃ ১০/৬৪

— শুদ্রানীর গর্ভজাত ব্রাহ্মণের কন্যাকে যদি কোন ব্রাহ্মণ বিবাহ করে কন্যা জন্ম দেয়, সেই কন্যাকে যদি অপর কোন ব্রাহ্মণ বিয়ে করে, আবার তাতে জাতক কন্যাকে যদি অপর ব্রাহ্মণ বিয়ে করে, এভাবে সপ্তজন্মে জাতক ব্রাহ্মণ হয়।

প্রায় অসম্ভব-অবাস্তব শ্লোকটি কী বলছে! ঠাকুর অনুকুল চন্দ্র কি এভাবে বর্ণবৈষম্যে দূর হবার কথা বলছেন?
ভাগবত শাস্ত্রে আছে, কোন শুদ্র যদি ব্রাহ্মণের মতো আজীবন ব্রহ্মচর্য পালণ করেন এবং তার বংশধররা সপ্তপুরুষ পর্যন্ত কঠোর ব্রহ্মচারী হন, তবে সপ্তপুরুষ পর ঐ বংশের অতীতের সপ্তম পুরুষটি যজ্ঞের অধিকার পাবেন। অবশ্য ততদিনে তিনি পঞ্চভূতে বিলিন, তাই এ অধিকার পরবর্তী জন্মে হয়তো বা প্রযোজ্য হবে। প্রশ্ন হল, যার সন্তান নাই বা বিয়ে হয়নি, তার ব্রহ্মত্ব প্রাপ্তি কিভাবে হবে? একেই বলে সাত মন তেল পুড়িয়ে রাধারানীকে নাচানো!

লক্ষনীয় যে, অনুলোম মতবাদে ব্রাহ্মণেতর শুদ্র বর্ণের মধ্যে উন্নত সংস্কৃতি, মেধা, জৈবিক গুনাবলী থাকতে পারে তা অস্বীকার করা হয়েছে। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এই ত্রিবর্ণের সহজ নারী সম্ভোগের পথ উম্মুক্ত ও প্রসস্ত করেছে অনুলোম পদ্ধতি। কারণ দ্বিজ বর্ণের পুরুষ স্ববর্ণ ছাড়াও নিম্নতর তিনটি বর্ণের নারীকে সম্ভোগ করে সন্তান উৎপাদন করবে; কিন্তু অদ্ভূত নিয়মে সন্তান পিতার উচ্চবর্ণ প্রাপ্ত হবে না। পিতার বর্ণে সম্পত্তিতে যে সন্তানের অধিকার নেই, এমন সন্তান পিতার লাম্পট্য লালসা চরিতার্থ ছাড়া কিছুই নয়। তাছাড়া অনুলোম পদ্ধতি আর্যদের বর্ণ সুবিধা সম্পূর্ন সুরক্ষা করে চলে। ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য এ তিন বর্ণের মধ্যে অনুলোম বিবাহ হলে সন্তান মাতার বর্ণ পেলেও তারা দ্বিজবর্ণই থাকে। কিন্তু শুদ্রের বেলায় অনুলোম সুবিধা নেই। যেহেতু শুদ্রের নিম্নতর কোন বর্ণ নেই। ত্রিবর্ণ দ্বিজগণ শুদ্রানীকে সম্ভোগ করেন বটে, তবে এভাবে জাত সন্তান শুদ্রই থেকে যায়। এমন অর্বাচীন বিধান কি আধুনিক মানুষের নিকট কোন যুক্তিতে গ্রহণযোগ্য হতে পারে?

প্রতিলোম বিধান সর্ম্পকে ঠাকুর অনুকুল চন্দ্রের মতামত যে কোন চরম বর্ণবাদীর মতামতকেও লজ্জা দেবে। মনু প্রতিলোম পদ্ধতিকে নিন্দনীয় বলেছেন, কিন্তু এর জন্য দায়ীদের ধ্বংশ বা নির্বংশ করার বিধান দেননি। ঠাকুর অনুকুল চন্দ্র যে কোন মূল্যে প্রতিলোম বিবাহ ঠেকানোর পক্ষে। তার মতে, প্রতিলোম বিবাহে উচ্চবর্ণের নারীরা নাকি কোনক্রমেই অধোবর্ণের পুরুষকে মনেপ্রাণে ভালবাসতে পারেন না। স্বামী স্ত্রীর মিলনের সময় তার নারীস্বত্তা বিদ্রোহ করে এবং উচ্চবর্ণের নারীর রক্তে পূর্বপুরুষগণ উপস্থিত হয়ে ‘হায় হায়! গেল গেল’ বলে আত্মরোদন করে। ফলে নারীটি গর্ভবর্তী হলেও উচ্চবর্ণের কোন গুণাবলীই নারী থেকে সন্তানে সঞ্চালিত হয় না। বরং উপজাত সন্তানে নিম্নবর্ণের পিতার খারাপ গুণগুলো প্রাধান্য পায়। এই জাতক হয় আত্ম বিধংসী, পরদ্বেষী, মানবতা বিরোধী, যুদ্ধবাজ, ক্রুড় ও ভয়ঙ্কর মতির । ঠাকুর অনুকুল চন্দ্র এসবের সপক্ষে যুক্তি হিসেবে দাঁড় করিয়াছেন, তিনি নাকি প্রতিলোম বিবাহ হয়েছে এমন নারীদের সংগোপনে জিজ্ঞাসাবাদ করে জেনেছেন, মিলনের সময় স্ত্রীর নাকি সহসা স্বামীকে লাথি মারতে অথবা কামড়ে দিতে ইচ্ছে করে। অনুুকুল চন্দ্র মনে করেন, প্রতিলোম পদ্ধতি ঈশ্বরের অনুমোদিত নীতি বিরোধী বলেই স্বামীর প্রতি এমন গর্হিত প্রতিক্রিয়া নারীর ভেতর দেখা যায়।
প্রতিলোম বিবাহ রোধ করার পক্ষেই শুধু তিনি নন, এ ধরণের বিবাহ হলে যাতে সন্তান উৎপন্ন না হয় তার জন্য নিম্নবর্ণের পুরুষটিকে জোর করে নিবীর্য করার পক্ষপাতি তিনি। এমন নিষ্ঠুর অমানবিক পদক্ষেপ নিতে হবে না-কি মানব জাতির বৃহত্তর কল্যাণার্থে! কী আজব কথা! শুদ্রের প্রতি প্রবল ঘৃনা আর অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তার মতামতে।

ঠাকুর অনুকুল চন্দ্রের বর্ণসংকর তত্ত্ব অযৌক্তিক :

ঠাকুর অনুকুল চন্দ্র তার অদ্ভূত মতামত দিয়েছেন সম্ভবত আধুনিক জীববিজ্ঞানের তত্ত্ব না জেনে। আধুনিক জীববিজ্ঞান, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, তার মতামতকে নাকচ করে দেয়। কারণ, সন্তান হলো পিতা মাতার মিলিত সৃষ্টি। বংশগতি, মেধা, জীবনীশক্তি সবকিছুই প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে সে প্রাপ্ত হয় পিতামাতার জিন বা ক্রেমোজন থেকে। প্রাকৃতিক নির্বাচন একটি যান্ত্রিক প্রক্রিয়া; উদ্দেশ্যমূলক কোন প্রক্রিয়া নয়। পৌরানিক যুগে মনে করা হত, স্ত্রী ক্ষেত্র মাত্র, পুরুষ সেখানে বীজ বপন করে। তাই সন্তান হয় পুরুষের অনুরূপ। যেমন, বটবৃক্ষের বীজ মাটিতে বপন করলে বটগাছ এবং ধান রোপন করলে ধান গাছ হয়। আধুনিক জীনবিজ্ঞান প্রমাণ করেছে, সন্তানের গুণাবলী পিতামাতা দুজনের জীনবাহিত। প্রতিলোমজ বা অনুলোমজ যে পদ্ধতিই হোক জনক জননীর গুণাবলী সন্তান প্রাপ্ত হবে বংশগতির স্বাভাবিক নিয়মেই। উচ্চবর্ণ নিম্নবর্ণ ইতাদি এক্ষেত্রে অবান্তর। নারী বা পুরুষের বর্ণ যাই হোক না কেন, সন্তানে পিতামাতার সমান সংখ্যাক ক্রোমোজম অর্থাৎ মোট ছেচল্লিশটি (২৩+২৩) সঞ্চালিত হবে। ক্রোমোজমে থাকা জীন সন্তানের সকল গুণাবলি নির্দ্ধারণ করে; আর এ জীন নারী ও পুরুষ থেকে প্রায় সমান সংখ্যক সন্তানে সঞ্চালিত হয়। সারকথা হল, শুদ্র ও ব্রাহ্মণীর পুত্র যে রকম গুণাবলী পিতামাতার নিকট থেকে পাবে, তেমনি ব্রাহ্মণ ও শুদ্রানীর সন্তান একই রকম জৈবিক গুণাবলী পিতামাতা থেকে পাবে। এক্ষেত্রে, প্রথমোক্ত সন্তানকে চন্ডাল ও দ্বিতীয় জনকে কায়স্থ বা বৈদ্য বলার কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
আর সংস্কৃতি হল, মানুষের অর্জিত গুণাবলী; বংশগতিতে প্রাপ্ত নয়। সমাজবিজ্ঞান বলে, সন্তান যেমন সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে থাকবে, তেমন সংস্কৃতিই অর্জন করবে। অনুলোমজ সন্তান পিতৃবর্ণ না পাওয়ায় পিতৃবংশে ঠাঁইও পায় না এ অবস্থায় তথাকথিত উন্নত পিতৃসংস্কৃতি কীভাবে পাবে? প্রতিলোম যে কারণে সমর্থন যোগ্য নয়, একই কারণে কি অনুলোম বাতিল হয়ে যায় না? তিন দ্বিজবর্ণের যৌন লালসার ক্ষেত্র প্রসারিত করার অভিপ্রায় ব্যতিত অনুলোমকে সমর্থন করার আর কোন ভিত্তি আছে কি?

এই পোস্টটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ ...
© All rights Reserved © 2020
Developed By Engineerbd.net
Engineerbd-Jowfhowo
Translate »