১৭ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ দুপুর ২:১৯
ব্রেকিং নিউজঃ

বিরুদ্ধ স্রোতে একজন নির্লোভ মুখ্যমন্ত্রীর ২০ বছর

রিপোর্টার নাম
  • আপডেট টাইমঃ রবিবার, মার্চ ৪, ২০১৮,
  • 106 সংবাদটি পঠিক হয়েছে

ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনের আগের কথা। মানিক সরকারের হাতে সঞ্চিত নগদ অর্থের পরিমাণ তখন ৪ হাজারেরও কম। না, আরসব রাজনীতিবিদের মতো করে পরিবারের অন্য সদস্যদের নামে সম্পদ রেখে তা গোপন করেননি মানিক সরকার। চাকরি থেকে ব্যাংকে ১২ লাখ টাকা সঞ্চিত রাখার পাশাপাশি তার অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তা স্ত্রীর হাতে থাকা টাকার পরিমাণ ২০,০০০। মায়ের উত্তরাধিকার সূত্রে বোনের সঙ্গে যৌথভাবে পাওয়া একটা টিন শেডের বাড়ি তার সম্পদ। দেহরক্ষীহীন ও গাড়িহীন, সরকারী বাড়িতে বসবাস। ২০ বছর ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী থাকা মানিক তাই ভারতের সবথেকে কম সম্পদশালী মুখ্যমন্ত্রী। সর্বস্তরে স্বীকৃত তার সততা। বিরোধীরাও আজও কেউ প্রশ্ন তোলেনি মানিকের যাপিত জীবন নিয়ে। সেই মানিক সরকারের হাত থেকে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীত্ব যাচ্ছে ‘বদলের’ ডাক দেওয়া বিজেপির হাতে। কী করেছিলেন মানিক সরকার, যার বদল দরকার?

উন্নয়ন-প্রবৃদ্ধি নিয়ে প্রচলিত পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক কাঠামোকে মানেননি মানিক, তিনি বিকল্প পথটাই বেছে নিয়েছিলেন। উন্নয়ন বলতে তিনি বুঝেছিলেন সুষম উন্নয়নকে। বুঝেছিলেন মানুষের সক্ষমতাকে। তাই সরাসরি শিল্পায়নকে প্রধান বিবেচ্য বানানো তার সরকারের নীতি ছিল না কোনদিন। পরিসংখ্যান বলছে, সাক্ষরতার হারে ত্রিপুরা ভারতের প্রদেশগুলোর মধ্যে প্রথম। ত্রিপুরার ৯৬ শতাংশ মানুষের কাছে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সুফল পৌঁছে দিয়েছিলেন মানিক সরকার। মার্ক্সবাদী বিশ্বাস অনুযায়ী তিনি মনে করতেন, শিক্ষায় বিনিয়োগের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে সমাজ-অর্থনীতিতে। শিক্ষাই এগিয়ে নিয়ে যাবে শিল্পায়নের পথে। নিশ্চিত করবে উন্নয়ন। তবে তা হয়নি। উল্টো বেকারত্বে সবথেকে এগিয়ে থাকা রাজ্যের খাতায় নাম লিখিয়েছে ত্রিপুরা। শিল্পায়নের অভাব, বেকারত্বের উচ্চহার, নিম্ন মাথাপিছু আয়, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতনের নিম্নহারের অভিযোগ মাথায় নিয়ে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে মানিককে। রয়েছে সরকারি চাকরিতে দলীয় প্রার্থীদের প্রাধান্য পাওয়ার অভিযোগও। তবে মানিক ক’দিন আগে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মানিক দাবি করেন, ত্রিপুরাকে উন্নয়নের ‘দ্বিতীয় পর্যায়’-এ উপনীত করেছেন। কর্মসংস্থান প্রশ্নে তিনি বলেছিলেন, কোনও প্রদেশই বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত নয়। ত্রিপুরার মতো ছোট প্রদেশের সক্ষমতার দিকটাও বিবেচনা করতে হবে বেকারত্ব নিয়ে সমালোচনা করার আগে।

যখন তিনি দায়িত্ব নিয়েছেন, ত্রিপুরা জুড়ে তখন বিদ্রোহীদের জয়জয়াকার। আর চতুর্থবারের মতো তিনি যখন ক্ষমতায় আসেন, ততদিনে সেই বিদ্রোহ অনেকটাই থিতিয়ে এসেছে। বিদ্রোহকে তিনি নিছক নিরাপত্তাজনিত প্রশ্ন আকারে দেখেননি। দমনকে মনে করেননি একমাত্র পথ। বরং নিরাপত্তা আর আইনসমন্বিত বলপ্রয়োগকে তিনি সব শেষ বিবেচনা আকারে দেখতেন।

মানিক সরকার ভারতের সবচেয়ে কম সম্পদশালী মুখ্যমন্ত্রী। তার হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ মাত্র ১ হাজার ৫২০ রুপি এবং ব্যাংকে গচ্ছিত রাখা আছে ২ হাজার ৪১০ রুপি। নির্বাচনের আগে ধনপুর আসনের প্রার্থিতার জন্য দেওয়া হল হলফনামায় সকল স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের হিসেব তুলে ধরেছিলেন কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়ার ৬৯ বছর বয়সী এই পলিটব্যুরো সদস্য।

মায়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে তিনি ও তার বোন একটি টিন শেডের বাড়ি পেয়েছেন। বাড়িটির মোট জায়গা ৪৩২ বর্গফুট। বাড়িটি শহরের বাইরে কৃষ্ণনগরে। ১৯৯৮ সাল থেকে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা মানিক সরকারের নিজের কোনও গাড়ি নেই। এখন তার ব্যাংকে যে রুপি গচ্ছিত আছে তা আগের চেয়েও কম। ২০১৩ সালের নির্বাচনের সময় দেওয়া হলফনামা থেকে জানা গেছে, তখন তার ব্যাংক হিসেবে ছিল ৯ হাজার ৭২০ রুপি।

চাকরি শেষে পাওয়া অর্থের বদৌলতে সম্ভবত, ব্যাংক হিসেবে ১২ লাখ টাকা গচ্ছিত রয়েছে মানিকের স্ত্রীর। রয়েছে ৬০ হাজার টাকা মূল্যের স্বর্ণালঙ্কার। বোনের সঙ্গে যৌথভাবে কৃষ্ণনগরে টিন শেডের একটি বাড়ি পেয়েছেন মানিক, তার মায়ের উত্তরাধিকার হিসেবে। তবে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে সরকারি বাড়িতেই থাকেন নিঃসন্তান মানিক সরকার। কোনও দেহরক্ষী নেই তাদের। নেই কোনও গাড়ি। দলীয় রীতি মেনে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে পাওয়া সরকারি ভাতার সবটাই তিনি দলকে দিয়ে দেন।

সিপিআই-এমের নেতা হরিপদ দাস ইন্ডিয়া টাইমসকে বলেছেন, ‘দলের রীতি অনুযায়ী,মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে পাওয়া বেতনের পুরো ২৬ হাজার ৩১৫ রুপিই মানিকদা দলের তহবিলে দিয়ে দেন। আর দলের কাছ থেকে ভাতা বাবদ ৯ হাজার ৭০০ রুপি নেন। আমরা মানিকদার সাধারণ জীবনযাপন অনুসরণ করার চেষ্টা করি। টিফিন হিসেবে তার সবচেয়ে পছন্দের খাবার মুড়ি। মানিকদার স্ত্রী পাঞ্চোলি ভট্টাচার্য কখনও সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেন না। তিনি রিকশা ও পাবলিক বাসেই যাতায়াত করেন বেশিরভাগ সময়।’ টাইমস অফ ইন্ডিয়াকে তিনি বলেছেন,‘সবচেয়ে দরিদ্র মুখ্যমন্ত্রী’ হিসেবে তাকে নিয়ে হওয়া আলোচনায় তিনি মজা পান।

খুব সাধারণ ঘরে জন্ম মানিক সরকারের। তার বাবা ছিলেন দর্জি আর মা সরকারি কর্মচারী। মাত্র ২৯ বছর বয়েছে ছাত্রনেতা থেকে সিপিএমের ত্রিপুরা রাজ্য কমিটির সদস্য হয়েছিলেন। ১৯৮০ সালে আগরতলা থেকে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হন তিনি। আর ৪৯ বছর বয়সে মানিক সরকার অভিষিক্ত হন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী পদে।

ত্রিপুরায় ২৫ বছরের বাম শাসনামলের ভেতর ২০ বছরই মানিক সরকার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। ‘চল বদলাই’ শ্লোগান দিয়ে জয়ের কাছাকাছি থাকা বিজেপির জন্য সহজ ছিল না তাকে পরাজিত করা। ত্রিপুরার জন্য নির্ধারিত সমন্বয়ক বিজেপি নেতা সুনীল দেওধরের কথাতেও সেটা স্পষ্ট। তিনি মন্তব্য করেছিলেন,‘দক্ষিণপূর্ব অঞ্চলের রাজ্যগুলোর মধ্যে ত্রিপুরাতে জয়ী হওয়াই সবচেয়ে কঠিন।’ কেন্দ্রে যখন বিজেপির অটল বিহারী বাজপেয়ী ছিলেন তখন মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন মানিক সরকার।

বিদ্রোহ দমনেও প্রচলিত পথ ব্যবহার না করে তিনি হেঁটেছেন অন্য পথেভ ত্রিপুরা বিদ্রোহ ও দ্বন্দ্ব নিরসনের প্রস্তাবের পরিবর্তে গল্প রচনা করেছে। তারা প্রচার করতে পেরেছে যে বিদ্রোহ কোনও অনতিক্রম্য বিষয় নয়। এটা করতে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো ছিল, সুশৃঙ্খল ও বহুমাত্রিক কৌশল, ইতিবাচক মানসিকতা, প্রবল ইচ্ছা, সঠিক লক্ষ্য ও নির্দেশনা, জ্ঞানী, সৎ ও বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্ব, আন্তরিক অভিপ্রায়, সমস্যা সৃজনশীল মোকাবিলা এমনকি সমাজের সবক্ষেত্রে আর্থ-সামাজিক-অবকাঠামোগত বিধান প্রণয়ন। এছাড়া মানবিক যুদ্ধ অভিযানের পাশাপাশি মানসিক অভিযান চালানোর মাধ্যমে বিদ্রোহী মনোগত অবস্থান পরিবর্তন করা।

বিদ্রোহের অস্থিরতা দূর করতে মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারের নেওয়া রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য দূর দূরান্তের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে সংগঠিত করা থেকে শুরু করে মানুষের মধ্যে বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা, সমাজের সব ক্ষেত্রে উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি জোরদার করতে রাষ্ট্রের আন্তরিকতা ও প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করতে হয়েছে। স্বাধীন উন্নয়ন সংস্থা, গ্রাম পঞ্চায়েত ও গ্রাম পরিষদের মতো ক্ষুদ্র গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী ও উজ্জীবীত করার পাশাপাশি বৈধতা দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠান ক্ষুদ্রতম স্থানীয় সরকার হিসেবে সক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়ে ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। এর মাধ্যমে শুধু আদিবাসীই নয়, সব সম্প্রদায়কে উন্নয়নের ধারায় যুক্ত করা সম্ভব হয়েছে।

শিল্পায়নের অভাব, বেকারত্বের উচ্চহার, নিম্ন মাথাপিছু আয়, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতনের নিম্নহার, সরকারি চাকরিতে দলীয় প্রার্থীদের প্রাধান্য পাওয়াসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে ত্রিপুরা সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল। এসব অভিযোগের জবাবে মানিক সরকার ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তার শাসনামলে অর্জিত সাফল্যগুলো তুলে ধরেছিলেন। তার মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে ৯০০ কিলোমিটার হাইওয়ে তৈরি ও নতুন ব্রডগজ রেললাইন স্থাপনের কথা জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, আগরতলা থেকে প্রতিদিন ২৬ থেকে ২৮টি বিমান উড্ডয়ন করে। দক্ষিণপূর্ব অঞ্চলে বিমান পরিবহনে গৌহাটির পরেই রয়েছে ত্রিপুরার আগরতলা। বিদ্যুৎ উৎপাদনেও ত্রিপুরা সাফল্য পেয়েছে। তারা ১৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশে রপ্তানি করে। সেচ ব্যবস্থাও তারা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে পেরেছে।

সাক্ষরতার হারে ত্রিপুরা ভারতের প্রদেশগুলোর মধ্যে প্রথম। ত্রিপুরার ৯৬ শতাংশ মানুষের কাছে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সুফল পৌঁছে দেয়ার কথাও জানিয়েছিলেন মানিক সরকার। তার ধারণা, এই সফলতাগুলোই শিল্পায়নের পথ তৈরি করে দিয়েছে। ত্রিপুরা উন্নয়নের দ্বিতীয় পর্যায়ে উপনীত হয়েছে দাবি করে মানিক আরও বলেছিলেন, কোন প্রদেশই বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত নয়। ত্রিপুরার মতো ছোট প্রদেশের সক্ষমতার দিকটাও বিবেচনা করতে হবে বেকারত্ব নিয়ে সমালোচনা করার আগে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে মানিক সরকারের ত্রিপুরাকেই ভারতের দক্ষিণপূর্ব অঞ্চলে সুশাসনের জন্য সবচেয়ে এগিয়ে থাকা রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল।

এতো কিছুর পরও মানিক সরকারের ব্যক্তিগত সততা আর নির্লোভ জীবনযাপন ঠেকাতে পারল না বিজেপির ‘চলো বদলাই’ স্রোতকে। ঝকঝকে উন্নয়নের স্বপ্ন, আদিবাসী-বাঙালি বিভক্তির সূত্র, বিভেদের প্রচারণা আর কেন্দ্রীয় সরকারের শক্তিকে ব্যবহার করে তারা থামিয়ে দিতে সমর্থ হয়েছে মানিক সরকারকে।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ ...
© All rights Reserved © 2020
Developed By Engineerbd.net
Engineerbd-Jowfhowo
Translate »