২০শে এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ভোর ৫:৫৯

আপনার অজান্তে কৃমি শরীরের সমস্ত পুষ্টি শুষে নিচ্ছে না তো?

রিপোর্টার নাম
  • আপডেট টাইমঃ মঙ্গলবার, মার্চ ১৩, ২০১৮,
  • 271 সংবাদটি পঠিক হয়েছে

কৃমি মানুষের শরীরে বসবাসরত একটি ক্ষতিকর পরজীবী। সাধারণত এরা মানুষের অন্ত্রে বাস করে শরীর থেকে পুষ্টি গ্রহণ করে বেঁচে থাকে এবং বংশ বৃদ্ধি করে৷ কৃমির ডিম্বাণু মানুষের মুখের সাহায্যে প্রবেশ করতে পারে আবার ত্বকের সাহায্যেও লাভা হিসেবেও প্রবেশ করতে পারে। অনেক সময় কৃমি মানুষের যকৃত বা অন্য কোন অঙ্গতেও আক্রমণ করতে পারে। কৃমি দেখতে অনেকটা কেঁচোর মতো এবং এই কৃমির রঙ হালকা হলুদ হয়ে থাকে। পরিণত অবস্থায় একটি কৃমি ৬ থেকে ১৪ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। আমাদের দেশে কেঁচো কৃমি, বক্র কৃমি ও সুতা কৃমিতে আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি৷

কৃমির প্রকারভেদ
কৃমি বিভিন্ন রকম হতে পারে। যেমন- গোল কৃমি (এগুলো সাধারণত গোল, পাতলা, সাদা বা গোলাপী রঙের হয় এবং লম্বায় ১০ থেকে ১২ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হতে পারে), সুতা কৃমি (এগুলো সুতার মত, ছোট, পাতলা এবং সাদা রঙের হয়), বক্র কৃমি (এগুলো আকারে খুবই ছোট, গারো গোলাপী রঙের হয় এবং খালি চোখে দেয়া যায় না), ফিতা কৃমি (এগুলো ২ থেকে ৩ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে)।

যেভাবে বংশবৃদ্ধি করে

সাধারণত দূষিত পানি, নোংরা খাবার এবং অপরিষ্কার শাকসবজি বা ফলমূলের মাধ্যমে কেঁচো কৃমির ডিম আমাদের মুখে প্রবেশ করে। আবার, আক্রান্ত ব্যাক্তির পোশাক থেকে বা হাত ঠিকমতো না ধুলেও কেঁচো কৃমির ডিম আমাদের পেটে যেতে পারে।
এই ডিম সেখান থেকে খাদ্যনালীর ক্ষুদ্রান্তে যায় এবং ক্ষুদ্রান্তের এনজাইম বা পাচকরসের সাহায্যে ডিম থেকে লার্ভা বের হয়৷
লার্ভাগুলো আবার রক্তের মাধ্যমে যকৃত, হৃদপিণ্ড এবং ফুসফুসে প্রবেশ করে এবং ফুসফুসের এলভিওলাই ছিদ্র করে শ্বাসনালী দিয়ে অন্ননালী পার হয়ে পাকস্থলীতে প্রবেশ করে ক্ষুদ্রান্ত্রে অবস্থান করে।

লার্ভাগুলো ক্ষুদ্রান্ত্রে এসে পূর্ণতা লাভ করে এবং ডিম পাড়ে৷
একটা স্ত্রী কৃমি মানুষের অন্ত্রে সাধারনত দৈনিক প্রায় ২ লাখ ডিম পারে।
১০ থেকে ৪০ দিনের মধ্যে ডিম থেকে বাচ্চা কৃমি তৈরী হয়।
পরে তা পায়খানার সাথে বাহিরে বেরিয়ে আসে।
পুনরায় সেই মল থেকে কৃমির ডিম এবং লার্ভা খাবারের সাহায্যে অথবা ত্বকের মাধ্যমে আবার সুস্থ মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।
কৃমি হওয়ার কারণ
কৃমির ডিম বা লার্ভা সাধারণত দূষিত পানি, নোংরা খাবার এবং অপরিষ্কার শাকসবজি বা ফলমূল, আক্রান্ত ব্যাক্তির পোশাক বা হাত ঠিকমতো পরিস্কার না করলে আমাদের মুখে প্রবেশ করতে পারে। আবার কৃমির লার্ভা মাটি থেকে পায়ের ত্বকের মাদ্ধমেও শরীরে প্রবেশ করতে পারে। বেশ কিছু কারণে কৃমি হতে পারে। যেমন-

দূষিত পানি বা খাবার খেলে।
রান্নার পূর্বে শাকসবজি, মাছ, মাংস ইত্যাদি ভালভাবে না ধুয়ে রান্না করলে।
সাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার না করলে।
পায়খানার পরে, খেলাধুলা বা কাজকর্মের শেষে এবং খাবার খাওয়ার পূর্বে সাবান দিয়ে ভালভাবে হাত পরিস্কার না করলে।
অন্যের পোশাক, তোয়ালে বা রুমাল ইত্যাদি ব্যবহার করলে।

কৃমির চিকিৎসা
কৃমি আছে কিনা সেটা নিশ্চিত হওয়ার জন্য অনেক ক্ষেত্রে মল পরীক্ষা করার প্রয়োজন হয়না। পায়খানা বা বমির সঙ্গে কেঁচো কৃমি বের হলে, রাতে মল দ্বার চুলকালে ধরে নেয়া যায় যে তার কৃমি আছে। যদি মল পরীক্ষার সুযোগ কিংবা সামর্থ্য না থাকে তাহলেও কৃমি আছে এরূপ সন্দেহ হলে মল পরীক্ষা না করিয়েও কৃমির ঔষধ খাওয়া যেতে পারে। তবে চিকিৎসা গ্রহনের আগে মল পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া ভালো৷ গর্ভবতী মহিলা, জ্বর ও ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে কৃমির ঔষধ খাওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ। অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বয়সভেদে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় ঔষধ খেতে হবে৷

কৃমি প্রতিরোধে করনীয়
কৃমি প্রতিরোধে নিম্নলিখিত বিষয়ে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবেঃ

সবসময় বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপদ খাবার খেতে হবে।
নিয়মিত গোসল করতে হবে এবং পরিষ্কার জামা কাপড় পরিধান করতে হবে।
নখ বড় রাখা যাবে না। কারন- অনেক ক্ষেত্রেই বড় নখের কারনে কৃমির ডিম নখের সাহায্যে পেটে প্রবেশ করতে পারে।
রান্নার পূর্বে ভালোভাবে শাক সবজি, মাছ, মাংস ইত্যাদি ধুয়ে তারপরে রান্না করতে হবে।
খাবার রান্না ও পরিবেশনের সময় অবশ্যই সাবান দিয়ে ভালভাবে হাত ধুতে হবে।
মল ত্যাগের পর অবশ্যই সাবান বা ছাই দিয়ে হাত ভালভাবে পরিস্কার করতে হবে।
জন্মের প্রথম ৬ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুকে শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধ খাওয়াতে হবে।
অবশ্যই বাইরে যাওয়ার সময় জুতা বা স্যান্ডেল ব্যবহার করতে হবে।

মল নিষ্কাশনের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে।
পায়খানা বা টয়লেট সব সময় পরিষ্কার রাখতে হবে।
প্রতি চার মাস অন্তর পরিবারের সবাইকে বয়স অনুযায়ী নির্দিষ্ট মাত্রার কৃমির ঔষধ খাওয়াতে হবে।
বাড়িতে কৃমি আক্রান্ত কেউ থাকলে সকলেরই সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এরকম ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শমত সবাইকে কৃমির ঔষধ খেতে হবে।

আক্রান্ত হলে সেসব জটিলতা হতে পারে?
কৃমিতে আক্রান্ত হলে বেশকিছু জটিলতা হতে পারে। যেমন- পুষ্টিহীনতায় আক্রান্ত হতে পারে, শরীরে রক্তশূণ্যতা দেখা দিতে পারে, শরীরের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্থ হতে পারে, শিশুদের ক্ষেত্রে, পেট ফুলে যেতে পারে, শরীর ফ্যাকাসে এবং দূর্বল হয়ে যেতে পারে, পেটে তিব্র ব্যথা অনুভুত হতে পারে, কোন কিছু বোঝা বা শেখার ক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে ইত্যাদি।

সঠিকভাবে হাত ধোয়ার নিয়ম

প্রথমে হাত এবং কবজি পানি দিয়ে ভালোমত ভেজাতে হবে।
এবার হাতে সাবান নিয়ে দুই হাতে ভালোমত ঘষে লাগাতে হবে।
তারপর বাম হাতের উপর ডান হাতের তালু এবং ডান হাতের উপর বাম হাতের তালু রেখে ভালোভাবে ঘষতে হবে।
প্রতিটি আঙ্গুলের মাঝে, নখের নিচে এবং আঙ্গুলের পিছনে ভালোমত পরিষ্কার করতে হবে।
ডান হাত দিয়ে বাম হাতের বুড়ো আঙ্গুল এবং বাম হাত দিয়ে ডান হাতের বুড়ো আঙ্গুল ধরে ভালভাবে ঘষে পরিস্কার করতে হবে।
হাতের তালুর উল্টা দিকের সাথে আঙ্গুলের ডগাগুলো ঘষে পরিষ্কার করতে হবে।
পানি দিয়ে ভালভাবে হাত ধুয়ে ফেলতে হবে।
পরিষ্কার তোয়ালে দিয়ে হাত মুছে ফেলতে হবে।
কৃমিনাশক ওষুধ কখন সেবন করবেন

দু’বছরের বেশি বয়সী শিশু অথবা বড়রা কৃমিনাশক ওষুধ চার মাস পর পর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সেবন করতে পারবেন।
একক মাত্রার ওষুধের ক্ষেত্রে বাতের বেলায় ওষুধটি সেবন করতে হবে।
অপুষ্টিজনিত রক্তস্বল্পতার ক্ষেত্রে কৃমিনাশক ওষুধ সেবন করলে উপকার পাওয়া যেতে পারে।
কৃমিনাশক ওষুধ সপরিবারে সেবনে কার্যকর ফল পাওয়া যায়।
কৃমিনাশক ওষুধ কখন সেবন করবেন না

অসুস্থ্য ব্যক্তির ক্ষেত্রে অথবা গ্যাস্ট্রিকের ওষুধের সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতিত কৃমিনাশক ওষুধ সেবন করা যাবে না।
গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে, কৃমিনাশক ওষুধ সেবন নিষিদ্ধ। তবে অপুষ্টির শিকার হলে এবং চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে গর্ভবতী মাকে শেষ প্রান্তিকে অনেক ক্ষেত্রে কৃমিনাশক ওষুধ সেবনের পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে।
কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়া কতটা নিরাপদ?
২ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের এবং বড়দের ক্ষেত্রে কৃমিনাশক ওষুধ সাধারণত বছরে দুই থেকে তিনবার সেবনের পরামর্শ হয়। অপরদিকে ২ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে, চিকিৎসকরা কোন ঝুঁকি নিতে চান না। বাজারে সাধারণত পাইরেন্টাল পামোয়েট, এলবেনডাজল, মেবেনডাজল এবং লিভামিজল জাতীয় কৃমিনাশক ওষধ পাওয়া যায়। নিম্নে এদের সম্মন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করা হলঃ

পাইরেন্টাল পামোয়েট জাতীয় ওষুধ সাধারণত ২ বছরের বেশি বয়সী শিশু ও বড়দের জন্য ব্যবহার করা হয়। এটি মূলত গুঁড়া কৃমির চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয় যদিও গোলকৃমি, বক্রকৃমি চিকিৎসার ক্ষেত্রেও ওষুধটি সমানভাবে কার্যকর। শিশু ও বড়দের জন্য একক মাত্রার ডোজ সেবনের পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। প্রথমবার সেবনের পরেও যদি কৃমির সংক্রমণ থেকে যায় তবে দু’সপ্তাহ পর আবার সেবনের পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। পাইরেনটাল পামোয়েট জাতীয় ওষুধ সেবনে কিছু কিছু ক্ষেত্রে পেটে ব্যথা, বমি বমি ভাব কিংবা ডায়রিয়া হতে পারে, যদিও সমস্যাটি তেমন গুরুতর নয়।

এলবেনডাজল মূলত ফিতা কৃমির চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়, যদিও এটি গুঁড়া কৃমি, বক্রকৃমি এবং গোল কৃমির চিকিৎসায়ও সমানভাবে কার্যকর। এলবেনডাজল একক মাত্রার ৪০০ মিলিগ্রাম ঔষুধ শিশু অথবা বড়দের কৃমিনাশক হিসেবে সেবনের পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। প্রথমবার সেবনের পরেও কৃমির উপদ্রব থাকলে দু’সপ্তাহ পর আবার ওষুধটি সেবনের পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। ওষুধটি সেবনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় পেট ব্যথা, বমি হওয়া, শরীরে র‌্যাশ, মাথাব্যথা, মাথা ঘোরানো, চুল পড়া, জ্বর জ্বর ভাব ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে যদিও এগুলো তেমন গুরুতর কিছু নয়।

মেবেনডাজল আরেক ধরনের পরিচিত কৃমির ওষুধ। এ ওষুধের কাজ অনেকটা এলবেনডাজলের মতোই। তবে এটি দিনে দু’বার পরপর তিনদিন খেতে হয়। এটি সেবনে এলবেনডাজলের মতোই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
লিভামিজল আর এক প্রকৃতির কৃমিনাশক ওষুধ। মানুষের পাশাপাশি পশু বা মাছের কৃমিনাশক হিসেবেও এ ওষুধটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। পরপর তিনদিন ৩০ মিলিগ্রাম মাত্রার ট্যাবলেট অথবা সিরাপ দিনে একবার করে সেবনের পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। লিভামিজল ক্যান্সারনিরোধক, নেফ্রোটিক সিন্ড্রোম জাতীয় কিডনির অসুখেও ব্যবহার হয়। এ ওষুধ সেবনে শরীরে বেশকিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এ ওষুধটি সেবন করা উচিত নয়।

সবশেষে
কৃমি অনেক পুরাতন একটি পেটের সমস্যা। বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে অনেক মানুষই কৃমি নামক সমস্যায় ভুগে থাকে। কৃমির যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই সাধারণত আমরা কৃমিনাশক ঔষধ ব্যবহার করে থাকি। কৃমিনাশক ওষুধ সেবনের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত। সুস্থ্য অবস্থায় কৃমিনাশক ওষুধ কিছুটা নিরাপদ হলেও অসুস্থ্য অবস্থায় বিপজ্জক হতে পারে। তাই অসুস্থ্য অবস্থায় কোনভাবেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কৃমিনাশক ওষুধ সেবন করা যাবে না। আবার কিছু খাবারে কৃমি প্রতিরোধী বা কৃমি নাশক উপাদান আছে। যেমন- গাজর, নারকেল, রসুন, কাঁচা পেঁপে, কাঁচা হলুদ, মিষ্টি কুমড়োর বীচি, লবঙ্গ, হলুদ ইত্যাদি।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ ...
© All rights Reserved © 2020
Developed By Engineerbd.net
Engineerbd-Jowfhowo
Translate »