৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ সকাল ১১:৫৭
ব্রেকিং নিউজঃ
ভারতে ‘লাভ জিহাদ’ রুখতে বিল পাশ মানিকগঞ্জে একটি হিন্দু পরিবারের উপর হামলা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের(ভি,এইচ,পি)তিন দফা হিন্দু সুরক্ষা আইন ও পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনের দাবি হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদকে নিষিদ্ধ করার দাবি বাংলাদেশ আওয়ামী ওলামা লীগ জয়ন্তী হালদারকে জোর করে তুলে নিয়েছিল রাশেদ উদ্ধার করে পুলিশ । হামলা চালিয়ে ইরানের শীর্ষ বিজ্ঞানীকে হত্যা তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিলেন শুভেন্দু-ঘনিষ্ঠ সিরাজ খান পার্বত্য চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বছরে ৪শ’ কোটি টাকার চাঁদাবাজি দৃশ্যমান হলো পদ্মা সেতুর ৫৮৫০ মিটার দুবলার চরে রাস পূর্ণিমায় নিরাপত্তা দিবে কোস্ট গার্ড

উৎসবদিনের নস্টালজিয়া

রিপোর্টার নাম
  • আপডেট টাইমঃ বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২০,
  • 121 সংবাদটি পঠিক হয়েছে

লেখা
অসীম চক্রবর্তী
বঙ্গে দেবী আবার সময় হয়ে এলো। এবার শরতে নয়, তিনি আসছেন হেমন্তে। চারপাশে দুঃখ, জরা, ব্যাধি, প্রেম, অপ্রেম, পাওয়া–না পাওয়ার হুতাশন। তবু এক লহমায় যেন আকাশের সাদা মেঘের ভেলা, সাদা কাশ ফুল আর শিউলি ফুলের শুভ্রতায় ঢেকে যায় সব কালো। আনন্দ উদ্‌যাপনের বারতা বয়ে মহালয়া আসে বংলায়। ছোটবেলায় শ্রাবণ-ভাদ্র মাস শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমীতে শতনাম পড়তাম গোল হয়ে বসে। সেখানে শুক-শারির দ্বন্দ্ব–কথায় ছিল দুটি লাইন:
আশ্বিনে অম্বিকা পূজা হর্ষ দেশে দেশে
কৃষ্ণ বিনে রাধা কাঁদে আলুথালু বেশে।
লণ্ডন ইলফোর্ডে উৎসব ক্লাবের পুজো
লণ্ডন ইলফোর্ডে উৎসব ক্লাবের পুজোছবি: লেখক

তখন থেকেই মনের মধ্যে দুর্গাপূজার উত্তেজনা এসে ভর করত অব্যক্তভাবে। সে এক অন্য অনুভূতি। সে এক অন্য জীবনের গল্প। আমাদের মধ্যবিত্ত বাড়ির পারিবারিক পূজার নিয়মমাফিক বংশ পরম্পরায় একজন আচার্য ঠাকুর মূর্তি তৈরি করেন। তাঁর বাবা এবং জ্যেঠা আমাদের বাড়ির প্রতিমা তৈরি করতেন। যদিও অন্যান্য জায়গায় আজকাল মৃৎশিল্পীরা মূর্তি গড়েন। পূজার মাসখানেক আগে থেকেই আচার্য ঠাকুর প্রতিমার চালা তৈরির মাধ্যমে মূর্তি গড়ার কাজ শুরু করতেন। সবকিছু প্রস্তুত থাকলেও দেবীর চক্ষুদান করা হতো মহালয়ার দিন। সংগত কারণে পূজার অন্যতম নস্টালজিয়ার জায়গা হলো মহালয়া। দেবীপক্ষের সূচনায় একটা অন্য রকম পরিবেশ তৈরি হয়। মহালয়ার দিন ভোরে বুকসমান জলে নেমে পিতৃ-মাতৃহীন সন্তানেরা পরলোকগত পিতা–মাতার উদ্দেশ্যে জল, তিল ও তুলসী দান করেন। সেই সঙ্গে সন্তানহীন পরলোকগত বিশ্বের সব মানুষের উদ্দেশ্যে জল দান করা হয়। আমিসহ আমাদের একান্নবর্তী পরিবারের প্রায় ২২ জন কাকাতো-জ্যেঠাতো ভাইবোনের বেশির ভাগই আমাদের ঠাকুরদা-ঠাকুরমাকে দেখিনি। তাই বাবা যখন আবক্ষ জলে নেমে তর্পণ করতেন, তখন আমরা বিশ্বাস করতাম বা এখনো করি যে পূর্বসূরি আপনজনেরা আমাদের পাশেই আছেন। আমাদের দেখছেন। আমাদের জন্য দেবীপক্ষের সময়টুকু যতটা আনন্দের, ততটাই আবেগের ঘেরাটোপে বন্দী।
বিজ্ঞাপন

মহালয়ার ভোরে ঘড়িতে অ্যালার্ম দেওয়া থাকত। লোমকূপে হালকা শিহরণ তোলা শরতের ভোরে বহু কষ্ট করে পুরোনো রেডিওর নব ঘুরিয়ে অবশেষে পৌঁছানো যেত আকাশবাণী কলকাতার স্টেশনে। শুরু হতো ভেতরটাকে আনন্দ আর উত্তেজনায় পূর্ণ করে শ্রী বীরেন্দ্র কৃষ্ণের মহালয়া অনুষ্ঠান মহিষাসুর মর্দিনী। শুরু হতো দেবীর বোধনবন্দনা। আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠল আলোক মঞ্জির…বারবার শোনা, তবু প্রতিবারই যেন নতুন। এভাবেই বঙ্গ সংস্কৃতির জৌলুশে ভরা শহর কলকাতার আকাশবাণী সাদা মেঘের ভেলায় চড়ে আসামের জঙ্গল–পাহাড় ছাড়িয়ে, সীমান্তের কাঁটা তারকে দুমড়েমুচড়ে, বীরেন ভদ্রের কণ্ঠমাধুর্যে শাশ্বত পুজোর আমেজ পৌঁছে দিত নদী–পাহাড় আর সবুজে ছাওয়া এপার বাংলার সিলেট জেলার একটি কিশোরের মনে। এভাবেই দেবী দুর্গা এক করে দেন সমগ্র বাঙালিকে অনেকটাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মোরা মিলেছি আজ মায়ের ডাকে…’ গানটির মতো।
প্রবাসে পূজামণ্ডপে সস্ত্রীক লেখক
প্রবাসে পূজামণ্ডপে সস্ত্রীক লেখকছবি: শুভ্র দাম

আসলে দুর্গাপূজার ইতিহাস প্রায় সবারই জানা। তবে দুর্গাপূজা যতটা না দেবী দুর্গার পূজা, ততটাই প্রকৃতি আর নারীর প্রতি আত্মসমর্পণের পালা। সেই সঙ্গে আছে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত এবং বাংলার মাটির সুরের সঙ্গে শ্যামাসংগীতের মিলেমিশে একাকার হওয়ার গল্প। ষষ্ঠী পূজায় দেবীর বোধন করা হয় মণ্ডপের বাইরে। পঞ্চগুঁড়ি, পঞ্চগব্য, পঞ্চশস্য, আম্রশাখা, মাটির তৈরি ঘট, বটের ডাল, তিল, হরীতকী, পুষ্প, দূর্বা, তুলসী, বিল্বপত্র, ধূপ, দীপ, ধুনা, আলপনা অঙ্কিত হাঁড়ি, শ্বেতশর্ষে, মাষকলাই, বটের পাতা, বেতের পাখা, শুভ্র (শ্বেত) বর্ণের নতুন বস্ত্রখণ্ড, কাঁচা হলুদ, ঘৃতপ্রদীপ, আঁতমরা ফল, লোহা, তালপত্র—এসব প্রাকৃতিক উপাদানে দেবীর বোধন করা হয়। চারপাশে বাজে গমগমে ঢাকের বাদ্য আর মঙ্গল শঙ্খধ্বনি। উৎসবে–আমেজে ভরে উঠে আবহমান বাংলার প্রকৃতি। খেয়াল করলে দেখা যাবে, প্রতিটি প্রাকৃতিক উপাদানই দেবীর বোধনের উপজীব্য।

মা দুর্গা ৯টি নারী রূপে সর্বত্র বিরাজিত। মার্কণ্ডেয় পুরাণে দেবীর ৯টি রূপকে ৯টি উদ্ভিদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। সপ্তমীর দিন সকালে সেই ৯টি উদ্ভিদ নদীর জলে স্নান করিয়ে শ্বেত অপরাজিতা লতা দিয়ে বেঁধে পাটভাঙা লাল পাড়ের সাদা শাড়ি জড়িয়ে ঘোমটা দেওয়া নারীর আকার দেওয়া হয়। তারপর সিঁদুর দিয়ে সপরিবার দেবীপ্রতিমার ডান দিকে দাঁড় করিয়ে পূজা করা হয়। যেন বাংলার অবারিত প্রকৃতি একত্রীভূত হয়ে নারী রূপে, মাতৃরূপে সংস্থাপন হয়েছেন গোটা বঙ্গে। দুর্গা প্রতিমার মতো শৈল্পিক কারুকাজময় উপস্থাপন আর নানান নন্দনে পূর্ণ প্যান্ডেলের সাজসজ্জা সম্ভবত পৃথিবীর খুব কম উৎসবেই হয়ে থাকে।
বিজ্ঞাপন

প্রতিমা স্থাপনের পরেই তৈরি হতো মহাস্নান। অর্থাৎ, যেসব উপাদানের মিশ্রণ দিয়ে মন্ত্রের মাধ্যমে দেবীকে স্নান করানো হবে, সেই মিশ্রণকে বলা হয় মহাস্নান। সেই মহাস্নান তৈরিও এক মহাযজ্ঞ। মহাস্নানে প্রয়োজন হয় ৩৩ ধরনের জল, তেল, মাটি; ৫ ধরনের ধাতু, পঞ্চকষায়, ৫ ধরনের শস্য, হলুদ; দেহপোজীবিনীর দ্বারের মাটি ইত্যাদি। অর্থাৎ, প্রকৃতির জল, মাটি, বায়ু আর গন্ধ নারী রূপে একাকার হয়ে দেবী দুর্গা রূপে আবির্ভূত হলেন। তবে এত আয়োজনের মধ্যে দেহপোজীবিনীর দ্বারের মাটি বিষয়টা নিয়ে সবার কৌতূহলের অন্ত নেই। কৌতূহল থেকে এর কারণ পড়ি। যুক্তিটা পড়ে নিমেষেই মনটা ভালো হয়ে গেল। উপনিষদে আছে, যেসব পুরুষ দেহোপজীবিনীর বাড়ি যায়, তাদের জীবনের সব পুণ্য সে বাড়ির মাটির সঙ্গে মিশে যায় এবং দেহোপজীবিনীর সব পাপ সেই পুরুষ মানুষটি সঙ্গে করে নিয়ে আসে। এভাবে সেই আলয়ের মাটি হয়ে উঠে পৃথিবীর পবিত্রতম মাটি এবং নিজের জীবন বাঁচানোর তাগিদে যাঁরা এমন রাস্তা গ্রহণ করেন, তাঁরা পাপমুক্ত হন। কয়েক হাজার বছর আগেও এমন যুক্তি দিয়ে সমাজসচেতনতা তৈরি কেবল ভারতীয় উপমহাদেশের সমাজ মনস্তত্ত্বে সম্ভব। দুর্গাপূজার টানা পাঁচ দিন বিরামহীন–অহর্নিশ প্রদীপ জ্বালানো হয়। আমাদের বাড়িতে দেখেছি, ঝড়–জলের রাতে বুকে আগলে রেখে প্রদীপের আলোকে জিইয়ে রাখা হয়। কারণ, বছরের এই পাঁচ দিনই মঙ্গলপ্রদীপের আলোয় মায়ের আশিস ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে। এমন সুযোগ যাতে অবিচ্ছেদ্যভাবে মানবসভ্যতা গ্রহণ করতে পারে, তার জন্য এই অহর্নিশ প্রদীপের বন্দোবস্ত। অষ্টমী-নবমীর মহাপূজা শেষে বিজয়া দশমীর বিষাদঘন ক্ষণের আবির্ভাব হয়।
প্রবাসে পূজা
প্রবাসে পূজাছবি: শুভ্র দাম

দুর্গা প্রতিমা বিদায়ের আলাদা কিছু গীত আছে, যা বাড়ির নারীরা আমাদের বাড়ির দশমীর পূজার সময়ে মণ্ডপের বারান্দায় পাটি পেতে বসে গাইতেন। অনেকটাই শিবরঞ্জনী রাগের করুণ সুরের মতো শোনা যেত। একজন এতে নেতৃত্ব দিতেন, বাকিরা দোহারে যোগ দিতেন।
‘শুভঘট সারি সারি
শুভযাত্রা করেন গৌরী
যাইতা গৌরী তাঁর শ্বশুরবাড়ি
গৌরী দেশে যাইতা…’

পিঁড়ির ওপরে আলপনা এঁকে সেই বড় ঘর, অর্থাৎ মূল ঘরের মেঝেতে পাতা হতো। তার ওপরে একটা ট্রাঙ্ক বা বাক্স রেখে তার ওপরে বসানো হতো নবপত্রিকার তৈরি প্রতিমা।
জ্যান্ত পুঁটি মাছের গায়ে সিঁদুরের ফোঁটা, ধান, দূর্বা, দই, মিষ্টি, মঙ্গলপ্রদীপ আর মাটির ঘটের জলে আমের পল্লবে জল ছড়িয়ে শান্তিমন্ত্র পাঠ করে হয় বিদায়ের আয়োজন।
একদিকে ঢাকের আওয়াজ, আরেক দিকে বিদায়ের সংগীত, শান্তিমন্ত্র আর সজল নয়ন—এক শোকাবহের সৃষ্টি করে। অদ্ভুত শূন্যতার বোধে বিদীর্ণ অন্তরাত্মা। অনেকটাই কনে বিদায়ের বিষাদের সুরের মতো বাজে বুকে।
প্রসাদ বিতরণ
প্রসাদ বিতরণছবি: শুভ্র দাম

তবু প্রতিবছর বিসর্জনের ব্যথা ভোলায় আগমনীর আনন্দ। আসছে বছর আবার হবে—এই আশায় আগামীর পথ চেয়ে থাকি আমরা। দুর্গাপূজার অন্যতম আকর্ষণ হলো সংগীত। ২০০ বছর আগে কালীভক্ত রামপ্রসাদ সেনের জন্ম। হ্যাঁ, সেই রামপ্রসাদ, যিনি বাঙালির রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন মধুমাখা রামপ্রসাদী সুর। যে সুরে মুগ্ধ হয়ে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের দিকপাল রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল দুজনেই রামপ্রসাদী সুরে মাতৃসংগীত রচনা করেছেন। ভাবতেই অবাক লাগে ২০০ বছর আগে রামপ্রসাদ যে বাণীতে সুরারোপ করে গান লিখেছিলেন, তা আজকের সময়েও বড্ড মানিয়ে যায়। বিষয়–বাসনায় মত্ত হয়ে লাইনচ্যুত রামপ্রসাদ বলছেন:
মা আমার ঘুরাবি কত
কলুর চোখ ঢাকা বলদের মতো।
ভবের গাছে বেঁধে দিয়ে মা পাক দিতেছ অবিরত
একবার খুলে দে মা চোখের ঠুলি,
দেখি শ্রীপদ মনের মতো।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ ...
© All rights Reserved © 2020
Developed By Engineerbd.net
Engineerbd-Jowfhowo
Translate »