৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ সকাল ১০:৪৩
ব্রেকিং নিউজঃ
ভারতে ‘লাভ জিহাদ’ রুখতে বিল পাশ মানিকগঞ্জে একটি হিন্দু পরিবারের উপর হামলা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের(ভি,এইচ,পি)তিন দফা হিন্দু সুরক্ষা আইন ও পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনের দাবি হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদকে নিষিদ্ধ করার দাবি বাংলাদেশ আওয়ামী ওলামা লীগ জয়ন্তী হালদারকে জোর করে তুলে নিয়েছিল রাশেদ উদ্ধার করে পুলিশ । হামলা চালিয়ে ইরানের শীর্ষ বিজ্ঞানীকে হত্যা তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিলেন শুভেন্দু-ঘনিষ্ঠ সিরাজ খান পার্বত্য চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বছরে ৪শ’ কোটি টাকার চাঁদাবাজি দৃশ্যমান হলো পদ্মা সেতুর ৫৮৫০ মিটার দুবলার চরে রাস পূর্ণিমায় নিরাপত্তা দিবে কোস্ট গার্ড

আগামী কাল শুক্রবার কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো !!

রিপোর্টার নাম
  • আপডেট টাইমঃ বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২৯, ২০২০,
  • 56 সংবাদটি পঠিক হয়েছে

দেবী লক্ষ্মী শ্রী-সম্পদ-ঐশ্বর্যদায়িনী। শরৎকালে দুর্গাপুজোর পর যে পূর্ণিমায় লক্ষ্মীপূজা হয়, তাকে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো বলা হয় এবং এই পূর্ণিমা ‘কোজাগরী পূর্ণিমা’ নামে অভিহিত। ‘কো জাগর্তি’ থেকে এই ‘কোজাগর’ কথার উৎপত্তি, এর অর্থ ‘কে জেগে আছে’? পুরাণের মতে, ঐ দিন রাতে লক্ষ্মী এসে বলেন, কে জেগে আছ, আজ আমি তোমাকে ধনদান করবো (নিশীথে বরদা দেবী কো জাগর্তি ইতি বাদিনি)। এ জন্য কোজাগরী পূর্ণিমার রাত্রিতে জাগরণের প্রথা আছে। ধনী-দরিদ্র, ব্রাহ্মণ-শূদ্র নির্বিশেষে সব বাঙালি হিন্দু গৃহস্থই লক্ষ্মীদেবীর পুজো করে থাকেন। প্রতিমা বা ঘটে উভয়ভাবেই লক্ষ্মীপুজো করা যায়।
এই বছর (২০২০) কোজাগরী পূর্ণিমা ৩০ অক্টোবর, শুক্রবার পড়েছে। পূর্ণিমা শুরু –৩০ অক্টোবর, বিকেল ৫টা ৪৭ মিনিটে। পূর্ণিমা
শেষ– ৩১ অক্টোবর, রাত ৮টা ২১ মিনিটে।
ঋগ্বেদের খিল সূক্তে শ্রী ও ঐশ্বর্যের দেবী অর্থে লক্ষ্মীর নাম পাওয়া যায়। শ্রী শব্দে সর্বজনের আশ্রয়যোগ্য হওয়া যায়। লক্ষ্মী শব্দের ব্যাখ্যা হল, যিনি সর্বদা সকলকে স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে (লক্ষ্যতে দৃশ্যতে বিশ্বং স্নিগ্ধদৃষ্ট্যা যয়া অনিশম্) দেখেন। শুক্ল যজুর্বেদ ও তৈত্তিরীয় সংহিতায় লক্ষ্মী ও শ্রীকে আদিত্যের দুই স্ত্রী রূপে দেখা যায়। শতপথ ব্রাহ্মণে প্রজাপতি হতে শ্রী’র উৎপত্তি, বলা হয়েছে। পরবর্তী যুগে লক্ষ্মী ও শ্রী ঐশ্বর্যের দেবী, বিষ্ণুর পত্নী এবং কামদেবের মাতারূপে খ্যাত। রামায়ণে বর্ণিত হয়েছে, দেবতা ও অসুররা যখন সমুদ্র মন্থন করেন তখন দেবী লক্ষ্মী পদ্মহস্তে সমুদ্র থেকে উখিত হন।
প্রথম থেকেই দেবী লক্ষ্মী অতি সুন্দরী ও কমনীয় কান্তি বলে পরিচিতা। শতপথ ব্রাহ্মণে আছে, প্রজাপতি সৃষ্টি করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে প্রজাপতির দেহ থেকে শ্রী বের হয়ে আসেন। এই দেবীর শ্রী এত সুন্দরী যে দেবতারা হিংসায় এঁকে হত্যা করতে উদ্যত হন। নারী হত্যা হতে প্রজাপতি সকলকে নিরস্ত করেন, তবে শ্রী’র সমস্ত বিভূতি দেবতারা আত্মসাৎ করতে পারেন, এই অনুমতি দেন। অগ্নি ইন্দ্র বরুণ মিত্র সবিতা প্রমুখ দশজন দেবতা তখন শ্রী’র প্রভাব, রূপ, সম্পদাদি হরণ করেন। নিঃস্ব শ্রী তখন প্রজাপতির কাছে প্রার্থনা জানালে তাঁর নির্দেশে এই দশজন দেবতাকে প্রসন্ন করে শ্রী আবার সমস্ত বিভূতি ফিরে পান। মানুষের জীবনের সব সদগুণাবলীই দেবী লক্ষ্মীর মধ্যে বর্তমান।
ব্রহ্মাণ্ড ও ভাগবতপুরাণে লক্ষ্মী দেবী ভৃগু ও খ্যাতির কন্যা রূপে বর্ণিত হয়েছেন। পদ্মপুরাণে বলা হয়েছে, প্রথমে সমুদ্র থেকে জন্ম পরে ভৃগুর কন্যা হিসেবে খ্যাত হন। নারদীয় ও কূর্মপুরাণে বলা হয়েছে, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিকেয় ও গণেশ এঁরা শিবদুর্গার সন্তান।
লক্ষ্মী ও সরস্বতী জয়া ও বিজয়া নামেও পরিচিত। সম্ভবত এই কথা মনে রেখেই কুচবিহারের বড় দেবীর (দুর্গা) দু’পাশে জয়া-বিজয়ার স্থান নির্ধারিত হয়েছে। মার্কন্ডেয়পুরাণে লক্ষ্মী দত্তাত্রেয় ঋষির পত্নী। অসুর-লাঞ্ছিত দেবতারা দত্তাত্রেয়ের শরণ নিলে লক্ষ্মীর কৃপায় তাঁরা বিজয় লাভ করেন।
দেবী লক্ষ্মী দ্বিভুজা ও চতুর্ভুজা, কখনো বা বহুভুজা। সব সময়েই পদ্মাসনা বা পদ্মাহস্তা এবং তপ্ত-কাঞ্চনবর্ণা। সব দেশেই পদ্ম সৃজনী শক্তির প্রতীক। শ্রীসূক্তে লক্ষ্মীকে পদ্মা, পদ্মবর্ণা, পদ্মস্থিতা ও আর্দ্রা বলা হয়েছে। ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে দেবী লক্ষ্মী দুর্গা সরস্বতী সাবিত্রী রাধা প্রমুখ পঞ্চ প্রকৃতির অন্যতমা। এই পুরাণে ইনি দুর্গতিনাশিনী দুর্গারূপেও (মহালক্ষ্মী) বর্ণিত হয়েছেন।
পুরাণাদিতে দেখা যাচ্ছে, লক্ষ্মী হয় প্রসূতি গর্ভে দক্ষকন্যা অথবা খ্যাতির গর্ভে ভৃগুকন্যা। অথচ আমরা অতি প্রাচীনকাল থেকেই শুনে আসছি লক্ষ্মী হলেন সমুদ্রোদ্ভবা, ক্ষীর সমুদ্র থেকে কমলাসনে তাঁর আবির্ভাব। তাহলে তাঁর আবার দেবকন্যাত্ব বা ঋষিকন্যাত্ব সম্ভব হয় কি করে? মনে হয় সমুদ্র মন্থনে ক্ষীরাব্ধি থেকে পদ্মাসনা লক্ষ্মীর আবির্ভাবের কিংবদন্তিটাই প্রাচীনতর। পরবর্তীকালে স্বায়ম্ভুব মনু থেকে মানব সৃষ্টির প্রসঙ্গে লক্ষ্মী সম্বন্ধে দেব-ঋষি ঘটিত নতুন উপাখ্যান গড়ে উঠেছে এবং পরে দুটি উপাখ্যানকে শিথিলভাবে জুড়ে দেয়া হয়েছে।
দেবী লক্ষ্মী তপ্তকাঞ্চনবর্ণা, আবার চন্দ্রপ্রভাতুল্যা শুক্লবর্ণাও দেখা যায়। অগ্নিপুরাণে দেবী চতুর্ভুজা এবং শঙ্খ-চক্র-গদা ও পদ্মধারিণী। তবে সাধারণত পাশ অক্ষমালা অভয় ও বরমুদ্রা হস্তা। বেল, শঙ্খ, পদ্ম, অমৃত, ঘট, পুস্তক বীণা, খেটক, গদা এবং ঝাঁপিও দেখা যায়। সাধারণত সব শাস্ত্রে লক্ষ্মী সুবেশা অলঙ্কৃতা পীন পয়োধারা সুশ্রোণী ও ক্ষীণকটি–এঁকে ন্যগ্রোধ পরিমণ্ডলা মূর্তি বলা হয়। কিছু কিছু গ্রন্থে হস্তিরা দেবীকে স্নান করাচ্ছে বলেও উল্লেখ আছে।
লক্ষ্মীর বহু প্রাচীন মূর্তিও পাওয়া গেছে। ভারহুতে প্রাপ্ত লক্ষ্মী মূর্তি দণ্ডয়মান, এক হাত কটিতে অপর এক হাতে পদ্ম। সাঁচি ও বৌদ্ধগয়াতেও অনুরূপ মূর্তি। বেসনগরে প্রাপ্ত মূর্তি ভগ্ন ও দণ্ডায়মান। এলোরায় কৈলাস মন্দিরে উৎকীর্ণ গজলক্ষ্মী মূর্তি অনুপম।
গুপ্ত পরবর্তী যুগে কিছু মুদ্রাতে অষ্টভুজা ও ষোড়শভুজা লক্ষ্মী মূর্তি আছে। গুজরাটে বীণাহস্তা লক্ষ্মীপূজার প্রচলন আছে। তন্ত্রসারে লক্ষ্মী কবচে দেবীর কাছে সুকবিত্ব, সুপাণ্ডিত্য ও সর্বসিদ্ধি প্রার্থনা করা হয়েছে। জয়সিংহের করণবেল শিলালিপিতে লক্ষ্মী নৃত্যগীত বাদ্য ও কাব্যের দেবী। বৌদ্ধ জাতক গ্রন্থে ইনি প্রজ্ঞার দেবী, এমনকি, তিথিতত্ত্বে দোয়াত ও লেখনী দেয়ারও নির্দেশ আছে। যেন বিদ্যাদেবী সরস্বতী। তবে সিদ্ধলক্ষ্মী নামে আর এক লক্ষ্মী আছেন, ইনি যুদ্ধের দেবী।
দেবী লক্ষ্মীর বাহন পেচক আধুনিককালের। প্রাচীন মূর্তিতে দেবী লক্ষ্মী কোথাও হস্তিবাহনা, কোথাও সিংহবাহনা, কোথাও বা কচ্ছপবাহনা। তোরমান সিলমোহর ও ইলোরাতে দেবী গরুড়বাহনা। উজ্জয়িনীমুদ্রাতে খ্রি. পূ. ২য় শতকে পদ্মের উপর দণ্ডায়মানা লক্ষ্মী মূর্তি রয়েছে। শুঙ্গবংশীয় মিত্ররাজাদের (খ্রি. পূ. ১০০-খ্রি. ১০০ অব্দ) মুদ্রাতেও বিদেশাগত ক্ষত্রপ রাজাদের মুদ্রাতেও লক্ষ্মী রয়েছেন। গ্রিক রাজা প্যান্টালিয়োন ও এগাথোক্লেস এর (খ্রি. পূ. ২য় শতক) মুদ্রাতেও লক্ষ্মী মূর্তি আছে।
কোজাগরী লক্ষ্মীর পুজো বাংলাদেশের সর্বত্র ব্যাপকভাবে হলেও দীপান্বিতা অর্থাৎ কার্তিকী অমাবস্যায় কালীপুজোর দিনেও কোথাও কোথাও লক্ষ্মীপুজো হয়ে থাকে।
কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোয় নারিকেলের সঙ্গে চিড়া ভক্ষণ, নারিকেল জলপান ও পাশা খেলা দ্বারা রাত্রি জাগরণে ধন-সম্পদ বৃদ্ধি পায়,
এমনটাই বলা হয়েছে। লিঙ্গপুরাণে আছে, লক্ষ্মীদেবী বরদাত্রী হয়ে বলছেন–নারিকেলোদকং পীত্বা অক্ষৈ র্জাগরণং নিশি। তস্মৈ বিত্তং প্রযচ্ছামি কো জাগর্তি মহীতলে।
লক্ষ্মীপুজোর তাৎপর্য—
১) দেবী লক্ষ্মী ভগবান বিষ্ণুর পত্নী, তিনি ছয়টি বিশেষ গুণের দেবী। তাঁর অপর নাম হল মহালক্ষ্মী।
২) শাস্ত্র মতে, মা লক্ষ্মী হলেন ধন-সম্পত্তির দেবী। তাই, ধন সম্পদের আশায় এবং পরিবারের মঙ্গল কামনায় ঘরে ঘরে দেবীর পুজো করা হয়ে থাকে।
৩) ধন ছাড়াও দেবী লক্ষ্মী জ্ঞান, জয়, খ্যাতি, বীরত্ব, স্বর্ণ, উচ্চভাবনা, অন্যান্য রত্নরাজি, শস্য, সুখ, বুদ্ধি, সুসন্তান, সৌন্দর্য, উচ্চাশা, সাহস ও শক্তি, নৈতিকতা, সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘজীবন প্রদান করেন।
৪) দেবীর পুজো করলে মানুষ সার্বিকভাবে সুন্দর ও চরিত্রবান হন।
৫) ধান, চাল, অন্ন, খাদ্যশস্য হল দেবী লক্ষ্মীর প্রতীক। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন যে, যারা খাদ্য অপচয় করে, তাদের ওপর দেবী লক্ষ্মীর আশীর্বাদ থাকে না।
৬) ভাদ্র সংক্রান্তি, পৌষ সংক্রান্তি, চৈত্র সংক্রান্তি, আশ্বিন পূর্ণিমা ও দীপাবলীতে লক্ষ্মী দেবীর পুজো করা হয়।
কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর প্রাবল্য ছিল পূর্ববঙ্গে–পশ্চিমবঙ্গে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর প্রচলন প্রায় ছিল-ই না বলা যায়। বিশেষ করে রাঢ়বাংলায় লক্ষ্মীপুজোয় কোনো মূর্তি ব্যবহৃত হত না। এখনও বহু গৃহে তা হয় না। কোজাগরী লক্ষ্মীর প্রচলন এপার বাংলায় মূলতঃ তাদেরই উদ্যোগে শুরু হয় যারা পূর্ববঙ্গের ঐতিহ্য ও সংষ্কৃতি সহ এপার বাংলার পরিবারের বধূ হিসেবে প্রবেশ করেছেন। রাঢ়বাংলার ঐতিহ্য অনুযায়ী আমাদের পরিবারে লক্ষ্মীর মূর্তি গড়ে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর নিয়ম নেই। ভাদ্র-পৌষ-চৈত্র সংক্রান্তিতে উপচে পড়া এক কাঠা ধান ও তার চারপাশে কাঠের পেঁচা, লক্ষ্মীর ঝাঁপি, পুতুল, কড়ি ইত্যাদি দিয়ে সাজানো হয়। একটা লাল শালু পিছন দিক থেকে ঘোমটার মতো ধানের ওপর রাখা হয়। এই লক্ষ্মী রাজলক্ষ্মী হিসেবে আমাদের মতো বহু পরিবারে পূজিতা হতেন বা হয়ে থাকেন। ইদানীং সুন্দর সুন্দর প্রতিমা এনে বছরে একবার লক্ষ্মীপুজোর রেওয়াজ শুরু হয়ে গেছে। কোজাগরী লক্ষ্মীর ক্যারিশ্মার সামনে পিছিয়ে পড়েছেন রাজলক্ষ্মী–যদিও আামি বা আমার মতো অনেকেই লক্ষ্মী বলতে এখনও রাজলক্ষ্মীকেই বুঝি !

এই পোস্টটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ ...
© All rights Reserved © 2020
Developed By Engineerbd.net
Engineerbd-Jowfhowo
Translate »