২রা মার্চ, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ রাত ১:৪৪
ব্রেকিং নিউজঃ
একুশে বিজেপির প্রার্থী বাছাইয়ে সঙ্ঘের ছোঁয়া,ডঃ জিষ্ণু বসু হতে পারেন মূখ্যমন্ত্রী । মোটা সূঁচ আনুন, নেতাদের চামড়া অনেক মোটা হয়! ভ্যাকসিন দেওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী কথা শুনে হেসে ফেললেন নার্স আব্বাস আর বামেদের সহবাসে বিজ্ঞানী না জিহাদি জন্ম নেয়, তসলিমার মন্তব্যে তুলকালাম মূর্খদের পিছনে সময় নষ্ট করা আহাম্মকী ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রার্থী তালিকা প্রকাশে দেরী কেন !! ভাইজানের ব্রিগেড !! বরিশালের বিখ্যাত সুগন্ধা নাসিকা-শক্তিপীঠ (তাঁরাবাড়ি) পরিদর্শনে আসার সম্ভাবনা রয়েছে – ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদির বাংলা মাসীকে চায় না ২ মে আমার কথা মিলিয়ে নেবেন পিকে: স্বপন মজুমদার মুশতাকের মৃত্যু: স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানাল যুক্তরাষ্ট্র রাজ্য রাজনীতিতে বিজেপি’র পর সিপিএম প্রধান বিরোধী শক্তি হয়ে ওঠার লক্ষ্যে ঘুঁটি সাজাচ্ছে !!

সভ্যতার শুরুতে গড়ে ওঠা করাতি সম্প্রদায় এখন প্রায় বিলুপ্ত!

রিপোর্টার নাম
  • আপডেট টাইমঃ সোমবার, ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২১,
  • 35 সংবাদটি পঠিক হয়েছে

প্রাচীন যুগে মানুষ বনে-জঙ্গলে, পাহাড়ের গুহায় বসবাস করতো। মধ্যযুগে এসে একটু একটু করে মানুষ যখন সভ্যতা বুঝতে শিখে, তখন বনের কাঠ-বাঁশ, ডালপালা, লতাপাতা দিয়ে ঘর বানাতে শুরু করে। ধীরে ধীরে উন্নয়ন ঘটতে থাকে সভ্যতার। সৌন্দর্যপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে মানবজাতি। উন্নয়ন ঘটে রুচিবোধেরও। আর তখন থেকেই নিরাপদে বসবাসের জন্য শুরু হয় ঘরবাড়ি নির্মাণ। মানুষ একসময় প্রয়োজন বোধ করে ভালো বাড়ি বাননোর। সুন্দর ও মজবুত বাড়ি বানাতে প্রয়োজন পড়ে গাছ কাটার। শুরুর দিকে লোহার করাতের আবষ্কিার বা ব্যবহার না জানলেও গাছ কাটার বিকল্প উপায় বের করে মানুষ। সঠিক দিনক্ষণ জানা নেই। তবে সভ্যতার বিবর্তনে একসময় আবিষ্কার হয়ে যায় লোহার হাত করাতের। এর পর থেকেই প্রচলন হয় করাত দিয়ে কাঠ চেরাইয়ের। করাতি সম্প্রদায় গড়ে ওঠে সমাজে।

কিন্তু সভ্যতার শুরুতে গড়ে ওঠা সেই করাতি সম্প্রদায় এখন প্রায় বিলুপ্ত। সচরাচর দেখা মেলে না এদের। অঞ্চলভেদে করাতি সম্প্রদায়ের হাতেগোণা দু-একটি পরিবার ধরে রেখেছে তাদের এই পুরনো ঐতিহ্য। তবে, যান্ত্রিক করাত কলের বিস্তার ঘটায় এখন তাদের আর আগের মতো কদর নেই। আগে তাদের মূল পেশাই ছিল এটি। সারাবছর গ্রামে গ্রামে ঘুরে কাঠ চেরাইয়ের কাজ করতো তারা। গ্রামের পথেঘাটে হাটলে প্রায় বাড়িতেই শোনা যেতো হাত করাতের টানের এক অন্যরকম ছন্দ। কিন্ত এখন তা অতীত। দুর্দিন তাই জীবন-জীবীকার তাগিদে অন্য পেশা বেছে নিয়েছে করাতি সম্প্রদায়ের লোকেরা। বর্তমানে অন্যপেশার পাশাপাশি বছরের মাত্র কয়েকমাস এই কাঠ চেরাইয়ের কাজ করে তারা।

সম্প্রতি বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার আমড়াগাছিয়া গ্রামে ঠিকাদার আমিনুল ইসলাম সাগরের বাড়িতে দেখা মেলে এই ক্ষয়িষ্ণু হাত করাতি সম্প্রদায়ের একটি দলের। তিনি দোকান ঘর তৈরির জন্য কাঠ কাটাতে এনেছেন তাদেরকে। খুলনার কয়রা উপজেলার মহারাজপুর গ্রাম থেকে এসেছেন তারা। দলের সদস্য তিনজন। এটি এখন আর মূল পেশা নেই তাদের। কৃষি ও অন্যান্য শ্রমিকের কাজ করেন তারা। শুষ্ক মৌসুরে কয়েকমাস করেন এই করাতির কাজ। তারা শরণখোলাসহ উপকূলের মঠবাড়িয়া, পাথরঘাটার বিভিন্ন গ্রামে কাঠ চেরাইয়ের কাজ করছেন গত ১০-১২ বছর ধরে।

করাতি দলের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য বাবর আলী গাজী ১২ বছর বয়েস থেকেই এই পেশায়। এখন তার ৭০। তিনি বলেন, আমার বাপ-দাদারা এই কাজ করতেন। আমি কাজ শুরু করি মামা হাসিব মল্লিকের সঙ্গে। তখন সাতক্ষীরা, খুলনা, কুষ্টিয়া, গোপালগঞ্জ, যশোর অঞ্চলে কাজ করতাম। সেসময় সারাবছরই কাজ হতো। বাপ-দাদার পুরনো পেশা ধরে রাখতেই এখন বছরে দু-চারমাস করি। অন্য সময় এলাকায় কৃষি কাজ করি।

বাবর আলী হতাশা প্রকাশ করে বলেন, কারেন্টের করাত কল গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে গেছে। মানুষ এখন সবকিছু সহজে করতে চায়। তাছাড়া বেশিরভাগ মানুষ পাকা বাড়ি তৈরি করছে। কাঠের ঘর খুবই কম হয়। তাই আমাদের আগের মতো কদরও নেই। করাতির কাজ করে এখন সংসারও চলে না!

দলের অন্য দুই সদস্য হারুন মল্লিক (৫০) ও আলমগীর মল্লিক (৫৫) বলেন, আগে মজুরি কম হলেও কাজ বেশি হতো। তাতেই পুশিয়ে যেতো। এখন মজুরি বেশি কিন্তু কাজ কম। আগে একটি করাতের দাম ছিল ৭০০ টাকা। আর এখন তা সাড়ে তিন-চার হাজার টাকা। অন্যান্য জিনিসপত্রের দামও বেশি। মাসকে মাস বাইরে থেকে খাওয়া খরচও বেশি হয়ে যায়। তাই এই পেশা পরিবর্তন করে আমাদের করাতি সম্প্রদায়ের লোকেরা বেশিরভাগই অন্য পেশায় চলে গেছে। আমাদের এলাকায় বর্তমানে চার-পাঁচটি পরিবার এই পেশায় নিয়োজিত আছে।

যান্ত্রিক করাত এবং হাত করাতে কাঠ কাটার গুণগত কোনো পার্থক্য আছে কি না জানতে চাইলে তারা বলেন, হাত করাতে কাঠের আশ ধরে কাটা হয়। এ কারণে কাঠ মজবুত হয়। মালের পরিমাণও বেশি হয়। আর কারেন্টের মিলে কাটলে কাঠের অপচয় হয় বেশি। মিলে যেভাবে খুশি সেভাবেই কাটার ফলে দেখতে সুন্দর হলেও আশ কেটে কাঠ দুর্বল হয়ে যায়। তাছাড়া, হাত করাত পরিবেশ বান্ধব। আগের যুগে হাত করাত দিয়ে কাটা কাঠের ঘর একশ’-দেড়শ’ বছর বয়স পেতো। কিন্তু এখন বছর যেতে না যেতেই কাঠের ঘর ভেঙে পড়ে। যারা হাত করাতে কাটার গুনাগুণ সম্পর্কে জানে-বোঝে তারাই আমাদেরকে ডাকে।

করাতিরা জানান, তাল গাছ কাটা হয় হাত হিসেবে। এক হাত তাল গাছ ১৬০ থেকে ২০০ টাকা। অন্যান্য গাছের তৈরি ঘরের খুঁটি, আড়া, কাচপাইড়, পেটি আট হাতি ২০ পিস তিন হাজার টাকা। চটা, রুয়া ও অন্যান্য মালামাল আট হাতি ২০ পিস চেরাই করেন আড়াই হাজার টাকা করে। তিন-চার মাসে সমস্ত খরচ বাদে তারা একেক জন ১৮-২০ হাজার টাকা আয় করেন। বাকি সময় এলাকায় অন্য কাজ করে কোনোরকম খেয়ে পড়ে আছেন তারা।

ঠিকাদার আমিনুল ইসলাম সাগর বলেন, আমি দোকান ঘর তৈরির জন্য হাত করাতি দিয়ে কাঠ কাটিয়েছি। হাত করাতে কাটার ফলে স-মিলের চেয়ে মালের পরিমাণ বেশি হয়েছে। স-মিলের চেয়ে খরচ একটু বেশি হলেও এতে অপচয় কম এবং কাঠও মজবুত হয়।

শরণখোলা সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও সমাববিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এইচ এম আব্দুল হালিম বলেন, তথাকথিত জমিদাররা বাদে আগেরকালে সবাই কাঠ দিয়ে ঘরবাড়ি তৈরি করতো। এজন্য হাত করতিরাই ছিল একমাত্র ভরসা। এখন এই সম্প্রদায় নেই বলেলই চলে। প্রযুক্তির উন্নয়নে হারিয়ে যাচ্ছে সম্প্রদায়টি। হাতে কাঠ কাটতে সময় ও খরচ বেশি। তাই যেটা সহজ সেটাই বেছে নিচ্ছে মানুষ। তবে, হাত করাতি সম্প্রদায় আমাদের গ্রামবাংলার ঐতিহ্য বহন করে। বাঙালি ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে এই সম্প্রদায়কে রক্ষা করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ ...
© All rights Reserved © 2020
Developed By Engineerbd.net
Engineerbd-Jowfhowo
Translate »