২৩শে এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ রাত ১২:১২
ব্রেকিং নিউজঃ
জুলাইয়ের আগে করোনার টিকা রপ্তানি অনিশ্চিত : সেরাম ইনস্টিটিউট পশ্চিমবঙ্গ ষষ্ঠ দফার ভোট মোটামুটি শান্তিপূর্ণ, সফর বাতিল মোদির এত মৃত্যু এত শূন্যতা আগামীকালের ষষ্ঠ দফার ৪৩-টি আসনে কোন দল এগিয়ে !! বাংলাদেশের ভোটার হয়ে কি ভাবে ভারতের বিধান সভায় নির্বাচন করছেন আলো রানী সরকার ? করোনায় মারা গেলেন কবি শঙ্খ ঘোষ বিজেপি মন্ত্রীসভার প্রধান মুখ হতে পারেন যাঁরা !! ঠিকাদারকে টাকা পরিশোধ না করায় থমকে গেছে উজিরপুরে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মান কাজ ।। ধুলো বালীতে ফ্যাকাশে হয়ে আছে ম্যূরাল।। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মিদের ক্ষোভ।। ফিরহাদের ভিডিয়ো নিয়ে কমিশনে বিজেপি, তৃণমূল প্রার্থীকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানাল গেরুয়া শিবির পশ্চিমবঙ্গে এক দিনে মোদির ৪ সভা

নেতাজি, বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ

রিপোর্টার নাম
  • আপডেট টাইমঃ মঙ্গলবার, এপ্রিল ৬, ২০২১,
  • 36 সংবাদটি পঠিক হয়েছে

শত শত বছরের অভিন্ন ভূখণ্ডকে খণ্ডিত করে যে স্বাধীনতা আসে তাতে নতুন করে জন্মলাভ করে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি আলাদা রাষ্ট্র। ধর্মের মৌল ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা লাভ করা পাকিস্তান অচিরেই আবির্ভূত হয় নব্য ঔপনিবেশিক চরিত্রে। পাকিস্তানের অংশ করা পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী নিজ দেশের অংশ নয়, ভাবতে থাকে নিছক উপনিবেশ হিসেবে। তাই সকল সম্পদ-ঐশ্চর্য নিংড়ে নিতে থাকে তারা। গোলামির চূড়ান্ত নিশ্চিত করতে তারা হাত দেয় বাঙালির চিরায়ত ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর। প্রতিবাদ ও বিপ্লব যে জাতির ধমনীতে, সেই বাঙালি জাতি অন্যায় নির্দেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রতিবাদে রাজপথে নেমে আসে। তাজা রক্ত দিয়ে ভাষার মান রক্ষা করে তারা। অবস্থা বেগতিক দেখে পিছু হটে পাকিস্তানি কর্তারা। এর মধ্য দিয়ে পূর্ব বাংলায় স্বাধিকার চেতনা এমনভাবে জেগে ওঠে যে পাকিস্তানের সুখস্বপ্ন একের পর এক ভঙ্গ হতে লাগল।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যেসব তরুণ নেতা ভূমিকা রেখেছিলেন তাদের অন্যতম পুরোধা শেখ মুজিব গণতান্ত্রিক উপায়ে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে পূর্ব বাংলাকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় আত্মনিয়োগ করলেন। অবিভক্ত ভারতের গোপালগঞ্জ মহকুমায় জন্ম নেওয়া মুজিব বরিশাল-মাদারীপুরে চাক্ষুষ করেছেন স্বদেশি আন্দোলন। স্বদেশি আন্দোলনের কর্মীদের কাছেই শুনতে থাকেন একজন সুভাষচন্দ্র বসুর কথা। কলকাতায় পড়তে গিয়ে মুজিব গভীরভাবে লক্ষ্য করতেন সুভাষচন্দ্রের কর্মপ্রয়াস। ব্রিটিশের মিথ্যাচারের স্মারক অন্ধকূপ অপসারণে সুভাষচন্দ্র বসুর হলওয়েল মুভমেন্টে অংশ নেন সদ্য কৈশোর অতিক্রান্ত মুজিব। সুভাষচন্দ্র থেকে নেতাজিতে অভিষিক্ত হবার পর তরুণ মুজিবের মাঝে নেতাজির প্রতি শ্রদ্ধা যেন আরও বেড়ে যায়। পাকিস্তানের শাসকদের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলে একাত্তরের যে মহান মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়, সেখানেও নেতাজির সংগ্রামী জীবানাদর্শ কী গভীর প্রভাব ফেলেছে তা আমরা সেই সময়ে শেখ মুজিবের বক্তৃতা-বিবৃতিতে স্পষ্ট হয়ে উঠতে দেখব।

নেতাজির আদর্শ সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে কতটা রেখাপাত করেছিল তা আমরা দেখতে পাবো বাংলাদেশে প্রথম নেতাজি জন্মোৎসব উদযাপনে। ২৩ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে বার্তা সংস্থা ইউএনআই পাঠানো খবর- ‘আজ ঢাকা ও বাংলাদেশের অন্যান্য স্থানে নেতাজি সুভাষচন্দ্রের জন্মদিনটি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে পালিত হয়। ছাত্রলীগ এ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক আলোচনাচক্রের আয়োজন করে। এই আলোচনাচক্রে ভারতীয় সংসদ সদস্য সমর গুহ, নেতাজির ভ্রাতুস্পুত্র অমিয়নাথ বসু, বাংলাদেশের খাদ্যমন্ত্রী ফণি মজুমদার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মুজফফর আমেদ চৌধুরী ভাষণ দেন। বক্তারা বলেন, শেখ মুজিব নেতাজির স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়িত করেছেন। বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠান সূচির ব্যবস্থা করা হয়। বিভিন্ন ছাত্র ও সাংস্কৃতিক সংস্থাও বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে দিনটিকে পালন করেন।’

এরপর আমরা ফিরে তাকাব এক মাস পরের দৃশ্যপটের দিকে। ১৯৭২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু কলকাতা আসেন। সেইদিনকার ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে শীর্ষ দৈনিক আনন্দবাজারের খবর ‘যুগ্ম-প্রণাম’ শিরোনামে। দৈনিকটি লিখছে, ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান রবিবার কলকাতায় এসেই দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন ও নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মূর্তিতে পুষ্পার্ঘ্য দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী হেলিকপ্টার থেকে নেমেই ওই গাড়ীতে ওঠেন। ঢাকা গাড়ি দু’জনে পাশাপাশি বসেন। …সেই গাড়ী এসে দাঁড়ায় আকাশবাণী ভবনের সামনে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের মূর্তির সামনে। তখন বেলা ঠিক এগারোটা। সেখানে গিয়ে দুই প্রধানমন্ত্রী চিত্তরঞ্জন দাশের মূর্তিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। নত হয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আবার ফিরে আসেন। গাড়ীর মিছিল এগিয়ে চললো। রাজ ভবনের অপরপ্রান্তে নেতাজি সুভাষচন্দ্রের বিরাট প্রতিমূর্তি। গাড়ী থেকে নেমেই বঙ্গবন্ধু থমকে দাঁড়ালেন। দিল্লি চলো ভঙ্গিতে আগুয়ান তেজোদীপ্ত বিরাট মূর্তির দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। হঠাৎ ডান হাত তুলে মাথায় ঠেকালেন সালাম। রাজনৈতিক গুরুকে শিষ্যের হাজারো সালাম। ওই মুহূর্তে তাকে খুব বিচলিত দেখা গেল। ইন্দিরা গান্ধীর কথায় চমক ভাঙ্গলো তার। এক সঙ্গে এগিয়ে গেলেন। দু’জনে দুটি পুষ্পস্তবক অর্পণ করলেন বেদীমূলে।’

নেতাজির প্রতি বঙ্গবন্ধুর যে প্রভাব তা বোধহয় অস্পষ্টই থেকে যাবে, যদি আমরা সেই অডিওবার্তার উচ্চারণ বিধৃত না করি। ‘নেতাজি যে অমর স্বাধীন বাংলাদেশই তার নির্ভুল প্রমাণ’ এমন উচ্চারণে মুজিব তার রাজনৈতিক শিক্ষককে অভিষিক্ত করেছিলেন। অখণ্ড ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের যে গভীর আদর্শিক পরম্পরার কথা নিবন্ধের প্রারম্ভে উল্লেখ করেছি তা বঙ্গবন্ধুর এই নেতাজি মূল্যায়নে তা হয়তো সামান্যই বর্ণনা করা গেল। তবে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত দৃশ্যপটে বাঙালি জাতিকে যে বিভক্তির দুর্ভাগ্যকে বরণ করতে হয় তা আবার ফিরে আসে ১৯৭৫-এ সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে। নানা চড়াই-উৎরাই পার করে স্বাধীন বাংলাদেশকে তার প্রকৃত চেতনা ও আদর্শের ধারায় প্রত্যাবর্তন করতে আরও অনেক বছর অপেক্ষা করতে হয়। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে রণাঙ্গনে একসঙ্গে লড়াই করে বাংলাকে মুক্ত করতে ভারতের বীর সেনানীরা যেমনভাবে লড়াই করে বহিঃশত্রু আক্রমণ থেকে বাংলাকে রক্ষা করেছে, তেমনি বাংলাদেশের জনগণকেও স্বাধীন দেশে গণতান্ত্রিক অধিকার ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ফেরাতে বহু সংগ্রাম করে যেতে হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশে বহু বছর যেমন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নির্বাসিত ছিল, তেমনি নেতাজির আদর্শিক চর্চাও ছিল স্থবির হয়ে।

তবে মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম তাদের গৌরবোজ্জ্বল অতীতকে খুঁজে নিতে ব্যর্থ হয়নি। তার জ্বলন্ত প্রমাণ ২০১৮ সালের ২৩ জানুয়ারি। সেদিন সগৌরবে ঢাকার মাটিতে গীত হয়েছিল ‘আমার সোনার বাংলা’ ও ‘জনগণমনঅধিনায়ক জয় হে’। হৃদয় পল্লবিত হয়ে সেদিন বাংলাদেশের তরুণ হৃদয়ে নেতাজি ফের অধিষ্ঠান করেন। এরপর থেকে নেতাজিপ্রেমী গণমাধ্যম ‘বহুমাত্রিক ডট কম’ ও তার আদর্শের চর্চায় নিবেদিত ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর নেতাজি সুভাষ আইডিওলজি’ যুগপৎভাবে বাংলাদেশে নেতাজি চর্চার পথকে শানিত করে যাচ্ছে। ঝিকরগাছার ব্রিটিশের ট্রানজিট ক্যাম্পে নেতাজির আজাদি সেনাদের নির্মম হত্যাযজ্ঞের অকথিত অধ্যায় সর্বসাধারণ্যে তুলে আনা, বাংলাদেশে নেতাজির স্মৃতিচিহ্ন খুঁজে বের করা, তার কালজয়ী অতিভাষণ ও রচনাসমূহ পঠনপাঠনের সুযোগ তৈরি করাসহ প্রতি বছর ২৩ জানুয়ারিকে ঘিরে বর্ণাঢ্য কর্মসূচিতে দেশপ্রেম দিবস তথা নেতাজির জন্মোৎসব উদযাপন তারই পুনর্জাগরণ দৃশ্যমান করেছে। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, সমকালীন সংকটে দুর্বিপাকে নেতাজির আত্মত্যাগের এই বিরল আদর্শই আমাদের এগিয়ে যাওয়ায় পথ দেখাবে। জয় বাংলা।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ ...
© All rights Reserved © 2020
Developed By Engineerbd.net
Engineerbd-Jowfhowo
Translate »