২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ভোর ৫:২৪
ব্রেকিং নিউজঃ

বাংলাদেশের হিন্দু প্রথম অধ‍্যায় পর্ব ― ৫

রিপোর্টার নাম
  • আপডেট টাইমঃ বৃহস্পতিবার, জুলাই ১, ২০২১,
  • 121 সংবাদটি পঠিক হয়েছে

বাংলাদেশের হিন্দু
প্রথম অধ‍্যায়
পর্ব ― ৫
কৃৃত্তিবাস ওঝা :
পৌষ সংক্রান্তিতে আমাদের গ্রামের একটি বড় মাঠের মধ্যে কুমির ও বাঘের মূর্তি বানিয়ে রাতের বেলা বারোয়ারি ‘কুলাই পূজা’ করা হয়। ঐ পূজা উপলক্ষে বিকেল বেলা মেলা বসে; স্থানীয় ভাষায় বলে ‘থৌল’।
পৌষ সংক্রান্তিতে সমস্ত সচ্ছল হিন্দু বাড়িতে গোসাঁই নবান্ন ও চিতই পিঠা খাওয়ার ধুম পড়ে যায়। আমরা গরীব, তাই আমাদের বাড়িতে ঐ উৎসব হয় না। দাদা আগে থেকে পরিকল্পনা করে রেখেছিল যে, এবার আমাদের বাড়িতে পিঠা-নবান্নের উৎসব হবে; এজন্য সে মাছ বিক্রি করা নিজস্ব টাকায়, পিঠা ও নবান্ন বানানোর জন্য এক জোড়া নারকেল, উৎকৃষ্ট চাল ও গুড় কিনে এনে রেখেছিল। ভোরবেলা এলাকার এক অবস্থাসম্পন্ন হিন্দু বাড়ি থেকে, আমাদের সবার পিঠা ও নবান্ন খাওয়ার নেমন্তন্ন করা হলো। বাবা সিদ্ধান্ত নিলো, আজ যেহেতু আমাদের অন‍্য বাড়িতে নেমন্তন্ন, তাই আমাদের বাড়ির পিঠা-নবান্নের উৎসব হবে, পরবর্তী দিন।
দুপুর বেলা নেমন্তন্ন খেয়ে ফেরার পথে, দাদা এক বাড়ি থেকে দীর্ঘক্ষণ দরদাম করে এককাঁদি পাকা সবরিকলা কিনলো। শীতকালে কলার ফলন কম হয়। তাই দাদা আশাবাদী হলো এই ভেবে যে, মেলায় সে ভালো দামে কলা বিক্রি করতে পারবে।
দাদার সাথে দিদি, আমি ও অমল মেলার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। শিশুবয়সী বৈমাত্রেয় বোন আলো, আমাদের পিছে পিছে কাঁদতে কাঁদতে এগিয়ে এসে বায়না ধরলো- সে আমাদের সাথে মেলায় যাবে। দাদা বিরক্তি প্রকাশ করে বললো “ধ‍্যাত্তরি ছাতা, দেরি হইয়া গ‍্যালে মুই ক‍লার গাহেক পামু! মোর আ্যতো টাহার কলাডি বারথে বইয়া পচপে হানে।”
দাদা আমাদের ফেলে, কলার কাঁদি কাঁধে নিয়ে দ্রুত পায়ে বের হয়ে গেল। অমল তার পিছু নিলো। দিদি, আলোর জামাকাপড় বদলিয়ে-চুল বেঁধে দিয়ে- ওকে কোলে তুলে, আমার হাত ধরে মেলার পথে পা বাড়ালো।
অমল যে রকম হিংস্র ও হিংসুটে প্রকৃতির, আলো ওরকম নয়। তার সাথে আমার যথেষ্ট সদ্ভাব ছিল। যদিও সে আমাকে ‘দাদো’ বলে ডাকতো না, অমলের মতোই নাম ধরে ডাকতো।
দিদি মেলার মধ্যে এ দোকান সে দোকান ঘুরে আলতার শিশি, চুলের ফিতা-ক্লিপ, কপালের টিপ ইত্যাদি নেড়েচেড়ে দেখছিল। দোকানদার দাম বলে, দিদি চুপচাপ রেখে দেয়। কি করবে, টাকা তো নেই! আলো বাচ্চাদের লাঠি লজেন্স খেতে দেখে, আমাকে বলে,”মদনা, মোরে ঐয়া কিইন্না দিবি।”
দিদি আলোরে ধমক দেয়, “তোরে না একশো দিন কইছি, অরে মদনা কইয়া ডাকপি না। দাদো কইয়া ডাকপি। বড়গো নাম লইয়া ডাকলে ঠাহুর পাপ দেয়।”
দাদার কাছে গিয়ে দেখি, সে গাহেকদের সাথে কথা বলতে ব‍্যস্ত। অল্প সময়ের মধ্যে কয়েক হালি কলা বিক্রি হয়ে গেল। দাদা, দিদির হাতে কিছু টাকা দিয়ে বললো, “ঐ মুড়ায় দ‍্যাখলাম জেলাপি ভাজে। আন যাইয়া। গরম দেইখ্যা আনিস। দাম বেশি চাইলে এক পোয়া কিনবি, হস্তা হইলে আধ জ‍্যর (আধা সের)।”
দিদি দুই দোকান যাচাই করে, জিলিপি কিনে আনলো। দাদা বললো,”দ‍্যাখ কয় হান ওঠছে। হগলডিরে হোমান বিলে ভাগ করইয়া দে।”
অমল বললো, “হে দি, মোরে কোলোম দুইহান বেশি দিবি। মদনা আর আলোরে একখান করইয়া কোম দিবি।”
আলো ঠোঁট বাঁকিয়ে অমলের দিকে তাকিয়ে বললো, “এ্যঁ !”
দাদা অমলকে বললো, “তোর মায় খালি ঋউস্বামী(সহিংস পক্ষপাতিত্ব) হরে। মোরা অজাতের ছাও না; ব‍্যাক্কেরে হোমান চোক্ষে দেহি, বোঝজো।”
এরপর দাদা তক্তা বিস্কুট (আটা দিয়ে বানানো কাঠের মতো শক্ত সস্তা বিস্কুট) ও বাদাম কিনে সমবন্টন করে খাওয়ালো।
প‍্যান্ট শার্ট পরিহিত জুতা পায় দেওয়া এক তরুণ এসে, কাঁদি থেকে একটা একটা করে কলা ছিড়ে নিজে খেতে লাগলো, আর গুণ্ডা প্রকৃতির সঙ্গীসাথীদের মধ্যে বিলাতে লাগলো। ঐ সময় গ্রামের কেউ সাধারণত প‍্যান্ট শার্ট পরে, জুতা পায় দিয়ে নিজস্ব এলাকায় বের হতো না। লুঙ্গি ছিল সর্বজনপ্রিয় নিম্নবাস। বয়স্ক হিন্দুরা ধুতি পরতো। ঐ তরুণটি, গ্রামের বসু পদবীর একটি বংশীয় বর্ণহিন্দু পরিবারের। সে তার বাবা-মায়ের চাকরির সূত্রে শহরে বেড়ে উঠেছে। ঐ তরুণ তখন কলেজে পড়াশোনার পাশাপাশি, উগ্রপন্থী ছাত্র রাজনীতি করতো। তার সঙ্গীসাথীরা এলাকার কয়েকটি অভিজাত মুসলিম পরিবারের শহরবাসী বখাটে সন্তান।
কাঁদিটিকে কলাশূন‍্য করে, বসু পদবীর তরুণটি যখন সঙ্গীসাথীদের নিয়ে চলে যাচ্ছিল, তখন দাদা বললো, “কলার দামডা?”
বসু পদবীর তরুণটি দাদার গালে ঠাস করে একটা চড় দিয়ে, ‘শুয়ারের বাচ্চা’ বলে গালি দিল। দিদি বললো,”আপনে দেহি ভদ্দর লোক বাড়ির পোলা। এইডা আপনের ক‍্যামন আচরণ!”
ঐ যুবকের সঙ্গীদের মধ্য থেকে ইসলাম ধর্মাবলম্বী এক গুণ্ডা, দিদির উদ্দেশ্যে অত্যন্ত অশ্লীল মন্তব্য করলো। দাদা বলে উঠলো, “আপনার ঘরে মা বুইন নাই!”
ঐ মুসলিম গুণ্ডা, দাদার চুলের মুঠি ধরে বুকের উপর দাম দাম করে ঘুষি মারতে লাগলো। দিদি আর্তনাদ করে আশপাশের লোকজনদের কাছে সাহায‍্যের আবেদন জানালো।
কয়েকজন হিন্দু যুবক ও মধ‍্যবয়স্ক লোক ছুটে এসে, মার থামালো। দাদার চুলের মুঠি ছেড়ে দিয়ে সেই মুসলিম গুণ্ডা বললো, “…(অশ্লীল গালি) মাইর খাবি, মাইরের দামও দিবি!”
পাল পদবীর এক পৌঢ় ঘটনার বিবরণ শুনে গুণ্ডাদের বললো, “কলা খাইছো, কলার দাম দিয়া দেও। খালিখালি মারলা ক‍্যা?”
বসু পদবীর গুণ্ডাটি বললো, “জ‍্যেঠা আপনে মোর সেইম কাস্টের, ছোডলোকের বাচ্চাগো পক্ষ লইলেন ক‍্যা!”
“তোমার লগের এ্যরা কোন কাস্টের?”
“এ্যরা তো মোসোলমান।”
“তুমি মোসোলমান লইয়া আইয়া, হিন্দুর উপার জুলুম করতে আছো, আবার কাস্টের দোয়াই দেও!”
আরেকজন ইসলাম ধর্মালম্বী গুণ্ডা, পাল পদবীর পৌঢ়কে বললো, “আঙ্কেল, আপনে তো দেখতে আছি ভীষণ কম‍্যুনাল। ধর্মের নামে এত বিদ্বেষ ভালো না। এই কম‍্যুনালিজমের পয়জন ইন্ডিয়া দিয়া আইছে। বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দ‍্যাশ।”
“তোমরা কেমন সম্প্রীতির কামডা করলা! গরীব ছ‍্যামড়ার কলা খাইলা। দাম না দিয়া, উল্ডা মাইর দিলা; মাইয়াউগ্গারে আকথা কইলা!”
“আপনার জাইত‍্যা ভাই দেইখ্যা গায় লাইগ্গা গ‍্যাছে। ঠিক কইছি না?”
আরেকজন ইসলাম ধর্মাবলম্বী গুণ্ডা, পাল পদবীর সেই পৌঢ়কে বললো, “হেইলে ঐ ছোড জাতেরে আপনেরা ঘরে ওঠতে দ‍্যান না কেন ?”
“হেইডা মোগো নিজস্ব ব‍্যাপার। কলা খাইছো, কলার দাম দেও।”
ক্ষীণদেহী শীল পাদবীর এক যুবক বললো, “খালি কলার দাম দেলে হইবে না। খালি খালি মারলো ক‍্যা! হেইয়ার বিচার হরতে হইবে। নাইলে আইজগো অরে মারছে, কাইলগো মোরে মারবে, পরশু আপনেরে মারবে।”
বসু পদবীর গুণ্ডাটিকে তেড়ে আসতে দেখে, শীল পদবীর যুবকটি ভোঁ-দৌড় দিলো।
হিন্দুরা বর্ণভেদ ভুলে একযোগে প্রতিবাদ করেছিল ঠিকই। কিন্তু কোন কাজ হলো না। গুণ্ডারা কলার দাম তো দিলোই না, উল্টো আচ্ছা রকম শাসিয়ে বীরদর্পে চলে গেল।
লোকজন বলাবলি করতে লাগলো, “বেইমান হিন্দু গুলাইনে, এই রহম শ‍্যাকেগো ডাইক্কা আইন্নাই তো হিন্দুগো সব্বনাশটা হরে। … ঘরের উঁন্দুরে বান কাডলে, হেই ঘর আর টেহে!”
পরদিন দাদা ভোর বেলা উঠে বললো, তার বুকটা ব‍্যথা করছে। দিদি বললো, “অসুরডায় জিবিলে ঘুইস‍্যাইছে! গরু খাউক্কার শক্তি না।”
বাবা বললো, “শীতকালের আঘাত যাইতে সময় লাগে।”
বাড়িতে পিঠা নবান্ন বানানো হবে, মনে আনন্দ নিয়ে ছাই দিয়ে দাঁত মাজতে মাজতে ঘরের ডোয়ার পাশে পিক ফেললাম। দিদিকে নারকেল দু’টো ছুলতে দিয়ে, বিমাতা দিদির ঘর লেপার অসমাপ্ত কাজ নিষ্পন্ন করছিল।
বিমাতা আমার দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, “বেইন্না কালে দুয়ারধারে এই বিলে কেও ছ‍্যাপ হালায়! আইজ তোর খাওন বন্ধ।”
বিমাতার শাস্তি ঘোষণার মানেই হচ্ছে, হাকিম নড়ে তো হুকুম নড়ে না। মনটা খারাপ হয়ে গেল, এতদিন যে উপাদেয় খাবারের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছি! সেই সাধের পিঠা-নবান্ন ভাগ্যে নেই!
দিদি কেবল নারকেল ছুলতে আরম্ভ করেছে, দাদা হাত ইশারায় তাকে থামার ইঙ্গিত দিয়ে বললো, “চাইল-গুর-নাহইল ব‍্যাবাক আনলাম মুই, মোর নিজের টাহায়। হেই পিডা-নবান্ন যদি মোর ভাই-ই না খায়!”
বিমাতা, দাদার কথার লাগাম টেনে ধরলো, “তোর কি খালি একটাই ভাই! আর গুলাইন কি? হে গুলাইনরে কি তোর বাপে জন্ম দে নায়!”
“তুমি কি হগলডিরে হোমান দ‍্যাহো! মুই সোংসারে খাডি কিরফান্নে, খাডি মোর ভাই-বুইন দুইডা আছে দেইখ্যা। বুইনডায় হাইঙ্গোডা দিন ঘরের কাম হরে, হেয়াতে তোমার মন পাইছে! এই বাড়থে মদনা যে বিলে আছে, হেয়ার চাইক্কা মানের বাড়ির বিলাই-কুত্তা ভালো থাহে।”
বাবা কাজে নিমগ্ন থেকেই দাদাকে বললো, “হেলে তোর আপন ভাই-বুইন লইয়া জুদা(পৃথক) হইয়া গেলেই পারো। তয় মোর বারথে কোলম জাগা হইবে না।”
‘তোমার পোলা মাইয়া তুমি খাওয়াবা। মোর হাত-রথ আছে, যেদিগে মন চায় হেদিগে হাইড্ডা যামু।”
আমি পুকুরে নেমে মুখ ধুয়ে, ক্ষুধা নিবারণের জন্য, গুটি গুটি পায়ে পাশের বাড়ির বড়ই গাছটির উদ্দেশ‍্যে বের হলাম।
দীর্ঘসময় পাশের বাড়ির প্রবেশ পথে দাঁড়িয়ে থেকে, ঐ বাড়ির লোকজনদের গতিবিধি লক্ষ্য করে, সুযোগ বুঝে বড়ইতলায় গিয়ে, পড়ে থাকা বড়ইগুলো নিঃশব্দে টুকিয়ে পরিধেয় ছেড়া প‍্যান্টের টোকর পরিপূর্ণ হয়ে ওঠার আগেই, ঐ বাড়ির একটি ছেলের ধাওয়া খেয়ে, বাড়ি ফিরে উঠানের কোনে দাঁড়িয়ে নিজ মনে বড়ই খাচ্ছিলাম। অমলকে এগিয়ে আসতে দেখে, মনে হলো- সে আমার বড়ই কেড়ে নিতে আসছে; এজন্য বড়ইপূর্ণ টোকর শক্ত করে চেপে ধরলাম। আমল বড়ই কেড়ে নিতে না পেরে, আমাকে ঠেলে মাটিতে ফেলে দিয়ে গলা টিপে ধরলো। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। নিজেকে মুক্ত করার প্রাণপণ প্রচেষ্টা চালাতে চালাতে অনুভব করছিলাম―চোখের সামনে সবকিছু ঘোলাটে হতে হতে যেন অন্ধকার হয়ে আসছে।
দাদা ছুটে এসে আমাকে মুক্ত করলো। অমল দাদাকে লাথি মারতেই, দাদা পাল্টা ঘুষি মারলো। বিমাতা ঝাড়ু দিয়ে দাদার মুখে সজোরে বড়ি দিয়ে বললো, “মোর পোয়াডারে হুদাহুদি মারলি ক‍্যা …(অশ্লীল গালি)! গুড়াগাড়া মানু(বাচ্চা ছেলে) ও নাইলে একটা লাথি মারইয়াই বইছে; হেয়াথে কি হইছে! বোঝদে পারছি, তোর পাখনা গজাইয়া গ‍্যাছে, হেইয়া না! এই দুয়ারে তোর ভাত জল বন্ধ…”
এরপর বিমাতা আমার গর্ভধারিণীর উদ্দেশ্যে এমন অভাবনীয় মন্তব্য করলো, যা আমরা পক্ষে উচ্চারণ করা সম্ভব নয়।
বাবা, দাদার উদ্দেশ্যে বললো, “শরীলে কুয়াদ(শক্তি) বেশি হইছে!”
“হ, দোষ তো ব‍্যায়াক খালি মোগো!” এ কথা বলতে বলতে দাদা বিষন্ন বদনে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলো।
(চলবে)

এই পোস্টটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ ...
© All rights Reserved © 2020
Developed By Engineerbd.net
Engineerbd-Jowfhowo
Translate »