১২ই জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ রাত ৯:১২

অভিজিত হত্যাকান্ডের পুরো বিষয়টি তদারক করেন মেজর জিয়া

রিপোর্টার নাম
  • আপডেট টাইমঃ বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ৯, ২০১৭,
  • 131 সংবাদটি পঠিক হয়েছে

প্রগতিশীল মুক্তমনা লেখক, ব্লগার অভিজিত রায় হত্যাকান্ডের সময়ে ঘটনাস্থলে থেকে হত্যাকান্ড- ঘটানোর তদারকি করেছেন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) সামরিক কমান্ডার সামরিক বাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া সৈয়দ জিয়াউল হক জিয়া।

সোমবার ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আহসান হাবীবের আদালতে পাঠানো হলে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে এসব তথ্য জানায়, গ্রেফতার হওয়া আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে সাকিব ওরফে সাজিদ ওরফে সাহাদ (৩৪)।

স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে সে বলেছে, অভিজিত রায় হত্যাকান্ডে অংশ নিয়েছে মেজর জিয়াসহ আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের মোট ১০ জন। এর মধ্যে ৪ জনের দায়িত্ব ছিল অভিজিতের ওপর সরাসরি আক্রমণ করার। বইমেলার বাইরেই অবস্থান করছিল তারা। সে নিজে (সোহেল) ৩ সহযোগী নিয়ে বইমেলার ভেতরে গিয়ে অভিজিতকে অনুসরণ করে। আর টিএসসির আশেপাশেই অবস্থান করে ‘বড় ভাই’ মেজর জিয়া ও শরীফুল ইসলাম ওরফে মুকুল রানা। বইমেলা থেকে বের হওয়ার পর আশকারি (হত্যাকান্ডে অংশ নেয়া সদস্য) দলের সদস্যরা (সিটিটিসি) একটু উত্তর দিকে ফুটপাথে অতর্কিত হামলা চালিয়ে হত্যা করে। আদালত সূত্রের বরাত দিয়ে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের (সিটিটিসি) তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সূত্রে এ খবর জানা গেছে।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট সূত্রে জানা গেছে, অভিজিত রায় হত্যাকান্ডে ঘটনায় রবিবার রাতে মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোড থেকে গ্রেফতার করা হয় আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে সাকিব ওরফে সাজিদ ওরফে সাহাদ (৩৪)। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে অভিজিত হত্যাকান্ডের বিস্তারিত বিবরণ জানানোর পাশাপাশি হত্যাকান্ডের সময় কার কী দায়িত্ব ছিল এবং তারা কোথায় অবস্থান করেছিল, সে বিষয়ও বর্ণনা করেছে।

স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে সাজিদ বলেছে, মেজর জিয়া ও সে ঘটনাস্থলেই অবস্থান করে সবকিছু তদারক করেছে। আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সামরিক কমান্ডার মেজর (বহিষ্কৃত) সৈয়দ জিয়াউল হককে সংগঠনের সবাই ‘বড় ভাই’ হিসেবে সম্বোধন করে থাকে । জিয়া নিজেই অভিজিত হত্যাকান্ডের পুরো বিষয়টি তদারক করে। তার সঙ্গে এই হত্যাকান্ডে আরও ৯ জন- যাদের মধ্যে ৪ জনের দায়িত্ব ছিল সরাসরি অভিজিতকে কুপিয়ে হত্যা করা। আর বাকি ৪ জনের দায়িত্ব ছিল অভিজিতকে অনুসরণ করা, যাদেরকে সংগঠনে ‘ইন্টেল গ্রুপ’ বলে অভিহিত করা হয়। সরাসরি হত্যাকান্ডে অংশ নেয়াদের বলা হয় ‘আশকারি’ সদস্য। সামরিক বাহিনী থেকে বহিষ্কৃত মেজর জিয়ার সঙ্গে ঘটনাস্থলে থেকে তদারক করে সংগঠনের মধ্যম সারির আরেক নেতা শরিফুল ইসলাম ওরফে মুকুল রানা। এই মুকুল গত বছর ঢাকার খিলগাঁওয়ে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়।

স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে বলেছে, সোহেল ওরফে সাকিব ওরফে সাজিদ ওরফে সাহাদ বলেছে, ২০১৪ সালে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমে যোগ দেয় সে। সোহেল ওরফে সাকিব ওরফে সাজিদ ওরফে সাহাদের সঙ্গে জিয়ার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। প্রথমে একটি ট্রেনিং সেন্টারে তাদের দেখা হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন আস্তানায় তারা একসঙ্গে অবস্থানও করে। অভিজিত হত্যাকান্ডের আগে অন্তত ৪ দিন সে জিয়ার নির্দেশে ও ইন্টেল সদস্য হিসেবে বইমেলায় গিয়ে অভিজিতকে অনুসরণ করে। লালমনিরহাটের আদিতমারীর বাসিন্দা সোহেল ওরফে সাজিদ। রাজধানীর তিতুমীর কলেজ থেকে বিবিএ পাস করেছে সে। এরপর সে নিজে ব্যবসা-বাণিজ্য করার চেষ্টা করে। পরবর্তী সময়ে আইটির ওপর কিছু ট্রেনিং কোর্স করে। ২০১৪ সালে সাজিদ মিরপুরে কোরআন শিখতে যেত। সেখানে রেজাউল নামে এক যুবকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সেই রেজাউলের মাধ্যমেই সে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমে যোগ দেয়।

একপর্যায়ে সে কথিত হিজরতের নামে বাড়ি ছেড়ে সংগঠনের বিভিন্ন মার্কাজে (আস্তানা) অবস্থান করে। আনসারুল্লাহ বাংলা টিম তাদের আস্তানাগুলোকে মার্কাজ হিসেবে অভিহিত করে থাকে। সোহেল ওরফে সাজিদের আইটি বিষয়ে বিশেষ দক্ষতা থাকায় তাকে সংগঠনের আইটি ও ইন্টেল শাখার দায়িত্ব দেয়া হয়। ইন্টেল শাখার সদস্য হিসেবে অভিজিত হত্যাকান্ডের আগে তার ব্লগার অভিজিতকে অনুসরণ করা ও ছবি সংগ্রহ করে শীর্ষনেতা বিশেষ করে বহিষ্কৃত মেজর জিয়ার কাছে রিপোর্ট করে। আদালত ছাড়াও তদন্তকারী সিটিটিসির কর্মকর্তাদের কাছেও জবানবন্দী দিয়েছে সোহেল।

স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে সোহেল ওরফে সাজিদ জানিয়েছে, অভিজিত রায় বইমেলা থেকে বের হওয়ার পর আশকারি (হত্যাকান্ডে অংশ নেয়া সদস্য) দলের সদস্যরা টিএসসির একটু উত্তর দিকে ফুটপাথে অতর্কিত হামলা চালিয়ে হত্যা করে তাকে। টিএসসির আশেপাশেই অবস্থান করে ‘বড় ভাই’ মেজর জিয়া ও শরীফুল ইসলাম ওরফে মুকুল রানা। ‘বড় ভাই’ মেজর জিয়াসহ মোট ১০ জন অভিজিত হত্যাকান্ডে অংশ নিয়েছিল, যার মধ্যে ৪ জন অভিজিতকে সরাসরি আক্রমণ করে। আক্রমণকারী দলটি বইমেলার বাইরেই অবস্থান করছিল। সে নিজে ৩ সহযোগী নিয়ে বইমেলার ভেতরে গিয়ে অনুসরণ করে অভিজিত রায়কে। হত্যাকান্ডের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আসছে কিনা, বা অবস্থান করছে কিনা তা তারা দৃষ্টি রাখছিল। কয়েক মিনিটের অপারেশন শেষে তারা সবাই ঘটনাস্থল থেকে সটকে পরে। পরবর্তী সময়ে জিয়ার নির্দেশে তারা বিভিন্ন মার্কাজে গিয়ে আত্মগোপন করেছিল। গত বছরের এপ্রিলে পুরান ঢাকায় নাজিমুদ্দিন সামাদকে হত্যার পর সাংগঠনিকভাবে তাদের চুপচাপ থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়। এ কারণে গত দেড় বছরে তারা আর কোন হত্যাকান্ডে অংশ নেয়নি।

স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়ার আগে সোহেল ওরফে সাজিদ সিটিটিসির কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে বলেছে, ‘বড় ভাই’ মেজর জিয়ার নির্দেশে সে আরও দু’টি হত্যাকান্ডে অংশ নিয়েছিল। এর একটি হলো শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে খুন হওয়া জাগৃতি প্রকাশনীর কর্ণধার ফয়সল আরেফিন দীপন ও আরেকটি হলো ব্লগার নীলাদ্রি নিলয় হত্যাকান্ড-। এই দুটি হত্যাকান্ডেও সোহেল ওরফে সাজিদের দায়িত্ব ছিল ইন্টেল সদস্য হিসেবে তাদের বিস্তারিত খোঁজ খবর করা। পরবর্তী সময়ে হত্যাকান্ডের সময় ঘটনাস্থলেই উপস্থিত থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের অনুসরণ করা। অভিজিত হত্যা মামলায় সোহেল ওরফে সাজিদকে আদালত কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে। সিটিটিসির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, অভিজিত রায় হত্যাকান্ডের মামলায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়ার পর সোহেল ওরফে সাজিদকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে আদালত। প্রকাশক দীপন ও ব্লগার নীলাদ্রী নিলয় হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে সোহেল ওরফে সাজিদকে। প্রগতিশীল মুক্তমনা লেখক, ব্লগার, প্রকাশক খুনের অনেক অজানা চাঞ্চল্যকর কাহিনী বের হয়ে আসবে বলে মনে করছেন সিটিটিসি কর্মকর্তারা।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ ...
© All rights Reserved © 2020
Developed By Engineerbd.net
Engineerbd-Jowfhowo
Translate »