২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ সন্ধ্যা ৭:২৭
ব্রেকিং নিউজঃ

ফিঙ্গারপ্রিন্ট তুলে আনল হত্যার নেপথ্য কাহিনী

রিপোর্টার নাম
  • আপডেট টাইমঃ রবিবার, মে ৫, ২০১৯,
  • 89 সংবাদটি পঠিক হয়েছে

২০১৭ সালের ২২ মার্চ। রাজধানীর বিমানবন্দর থানার বেড়িবাঁধের ভিআইপি রোড-সংলগ্ন টানপাড়ায় বস্তাবন্দি একজনের মৃতদেহ দেখে পুলিশে খবর দেয় এলাকাবাসী। পুলিশ সেখানে গিয়ে বস্তার ভেতর রশি দিয়ে পেঁচানো মস্তকহীন এক তরুণীর লাশ উদ্ধার করে। নিহতের শরীরে কোনো পোশাকও ছিল না। নিহত নারীর ফিঙ্গারপ্রিন্টের সূত্র ধরে দীর্ঘ দুই বছর তদন্ত করে এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কাহিনী তুলে এনেছে ডিবি পুলিশ, যা গল্পকেও হার মানায়।

অজ্ঞাতপরিচয় নিহত তরুণীর ফিঙ্গারপ্রিন্ট জাতীয় পরিচয়পত্রের সার্ভারে সংরক্ষিত তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে পুলিশ জানতে পারে, তার নাম কুলছুম বেগম। গ্রামের বাড়ি মাদারীপুরের কালকিনির তালিমপুরে। ২৫ বছরের এই বিবাহিত তরুণী রাজধানীর পল্লবীর ইলিয়াস মোল্লার বস্তিতে থাকতেন। একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন তিনি।

পরিচয় নিশ্চিত হলেও কেন, কারা তাকে হত্যা করেছে, সেই ক্লু মেলাতে পারছিল না থানা পুলিশ। মামলাটির তদন্তভার ন্যস্ত হয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর বিভাগের কাছে। ফোন রেকর্ড ও ধর্ষণের আলামত পরীক্ষার প্রতিবেদনের সূত্র ধরে দুই বছর পর কুলছুম হত্যার নেপথ্য কাহিনী জানা গেছে বলে দাবি করেছে পুলিশ। তদন্তে জানা গেছে, তিনজন কুলছুমকে হত্যার পর লাশটি দুই টুকরো করে গুমের চেষ্টা চালায়। তাদের মধ্যে একজনের সঙ্গে হত্যার আগে কুলছুমের শারীরিক সম্পর্ক হয়। অন্য দু’জন তাকে ধর্ষণের চেষ্টা চালালে তিনি রেহাই পাওয়ার চেষ্টা চালান এবং চিৎকার করে ওঠেন। তখন তার মুখ বন্ধ করতে কাপড় গুঁজে দেয় অভিযুক্ত কয়েকজন। শ্বাস-প্রশ্বাস আটকে সেখানেই তার মৃত্যু ঘটে।

তদন্ত-সংশ্নিষ্ট ডিবির উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা সমকালকে জানান, কুলছুম তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পল্লবীর বস্তিতে থাকতেন। এ সময় তার সঙ্গে পাশের বাসিন্দা গাড়িচালক এনামুল হকের পরিচয় হয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে পরকীয়ার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই বস্তির পাশের সি ব্লকের দুই বাসিন্দা ও এনামুলের পূর্বপরিচিত মাছ বিক্রেতা কালু ও কাসেম তাদের এই সম্পর্কের কথা জেনে ফেলে। বস্তি এলাকায় তারা একসঙ্গে ক্যারম খেলত। একদিন এনামুলকে কালু জানায়, কুলছুমের সঙ্গে সেও ‘ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে’ জড়াতে চায়। এ প্রস্তাব পেয়ে এনামুল তার কাছে ২০ হাজার টাকা দাবি করে। টাকা পাওয়ার পর এনামুল কালুকে ২২ মার্চ সকাল ৮টার দিকে তার বাসায় যেতে বলে।

ডিবি কর্মকর্তা জানান, ঘটনার দিন সকালে এনামুল বেশ কয়েকবার কুলছুমের মোবাইল ফোনে কল করে। ফোন রিসিভ করার পর এনামুল তার সাজানো ছক অনুযায়ী কুলছুমকে জানায়, তার ডায়রিয়া হয়েছে। শরীর খুব দুর্বল। স্যালাইন এবং ওষুধ নিয়ে তাকে যেন কুলছুম দেখতে আসে। এনামুলের কথা বিশ্বাস করে সকাল ৮টার দিকে তার বাসায় যান কুলছুম। এ সময় এনামুল তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে। এরই মধ্যে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী কালু ও কাসেম এনামুলের বাসায় যায়। তারা ঘরে ঢুকে কুলছুমকে ধর্ষণের চেষ্টা চালায়। কুলছুম চিৎকার করার চেষ্টা করলে তার মুখের মধ্যে কাপড় গুঁজে দেওয়া হয়। মিনিট পাঁচেক পর তারা তিনজন নিশ্চিত হয়, শ্বাসরোধে মারা গেছেন কুলছুম।

ডিবি সূত্র জানায়, কুলছুমের মরদেহ গুম করতে অভিযুক্ত তিন হত্যাকারী তাৎক্ষণিকভাবে ফন্দি আঁটে। এনামুলকে ৫০ টাকা দিয়ে দ্রুত পলিথিন ও বস্তা নিয়ে আসার নির্দেশ দেয় কালু। এসব আনার পর এনামুলের ঘরে থাকা বঁটি দিয়ে কুলছুমের গলা কেটে ফেলে সে। গামছা দিয়ে হাত-পা বেঁধে কুলছুমের মস্তকহীন শরীর পলিথিনে মুড়িয়ে একটি বস্তায় ঢোকানো হয়। মস্তক ঢোকানো হয় আরেকটিতে। খণ্ডিত মস্তকের বস্তা নিয়ে কালু ও কাসেম মিরপুর ১২ নম্বর বাসস্ট্যান্ডের ড্রেনের একটি স্থানে ছুড়ে ফেলে। একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে আরেকটি বস্তা নিয়ে এনামুল যায় বিমানবন্দর এলাকায়। সেখানে রাস্তার পাশে বস্তাবন্দি মস্তকহীন লাশ ফেলে পালিয়ে আসে সে।

মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ডিবির উত্তর বিভাগের ডিসি মশিউর রহমান সমকালকে বলেন, কুলছুম হত্যা ছিল একটি ক্লুলেস ঘটনা। তদন্তের নানা সূত্র প্রয়োগ করে দীর্ঘদিন পর এ হত্যার আসল কাহিনী বের করা গেছে। এ হত্যার সঙ্গে জড়িত তিনজনই অত্যন্ত ধুরন্ধর। ডিএনএ প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যায়, হত্যার আগে কুলছুমের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক তৈরি করা হয়েছিল। হত্যার কথা এনামুল বারবার অস্বীকার করলেও শেষ পর্যন্ত আসল সত্য বেরিয়ে এসেছে।

ডিবির এডিসি মহরম আলী মাসুদ বলেন, এ মামলায় এনামুল জামিনে রয়েছে। তার জামিন বাতিলের আবেদন করা হবে। অন্য দুই অভিযুক্ত কালু ও কাসেমকে গতকাল শুক্রবার আটক করা হয়েছে। তারা এই হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। শনিবার (আজ) রিমান্ড আবেদন করে তাদের আদালতে তোলা হতে পারে।

কুলছুমের ছোট ভাই মো. রাজীব সমকালকে বলেন, খোঁজাখুঁজির পরও কুলছুমকে না পেয়ে তার মা হনুফা বেগম পল্লবী থানায় জিডি করেন। পরে ফিঙ্গারপ্রিন্টের সূত্র ধরে তার দেহখণ্ড উদ্ধার হয়। ঘটনার পর থেকেই অনেকে এনামুলকে সন্দেহ করে আসছিল। তখন তার কাছে কুলছুমের খবর জানতে চাইলে উল্টো সে বলেছিল, ‘কুলছুমের সন্ধানে পীর-ফকির ধরতে হবে।’

রাজীব জানান, একটি গোপন সিম নম্বর ব্যবহার করে এনামুল তার বোনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। এনামুলেরও স্ত্রী-সন্তান রয়েছে। বারবার নিষেধের পরও সে কুলছুমের সঙ্গে যোগাযোগ করত। তার সঙ্গে সম্পর্ক না রাখলে নানা হুমকি দিত। এনামুলসহ জড়িত অন্যদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন রাজীব।

পুলিশের কাছে গাড়ির মালিকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন শারীরিক অসুস্থতার কথা বলে গাড়ি চালাতে যায়নি এনামুল। প্রাইভেটকার চালক হলেও বস্তি ঘিরে সে একটি অপরাধ সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিল।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ ...
© All rights Reserved © 2020
Developed By Engineerbd.net
Engineerbd-Jowfhowo
Translate »