১৪ই জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ রাত ৮:২৬

বাংলাদেশের হিন্দু।

রিপোর্টার নাম
  • আপডেট টাইমঃ সোমবার, মে ১০, ২০২১,
  • 54 সংবাদটি পঠিক হয়েছে

কৃত্তিবাস ওঝা
প্রথম অধ‍্যায়
পর্ব – ১
আমি বাংলাদেশের একজন হিন্দু। বর্তমানে সবাই আমাকে ডঃ অভিনব রায় নামে চেনে। নামটি আমার শিক্ষকের দেওয়া; ডিগ্রিটি অনেক সাধনার ফসল। পারিবারিক নাম ছিল মদন; কুলপদবী ঘরামি। পূর্বপুরুষ জাতিতে নমঃশূদ্র। তবে আমি নিজের বর্ণ পরিচয় বিলুপ্ত ঘোষণা করেছি অনেক আগেই।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমি যখন হামাগুড়ি দেওয়া থেকে দু’পায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলাম, তখন পাকিস্তানের অখণ্ডতাপন্থী একদল ইসলাম ধর্মাবলম্বী বাংলাভাষী – আমাকে মায়ের কোল থেকে জোর করে কেড়ে নিয়ে, নিকটস্থ পুকুরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে- মাকে উন্মুক্ত জনপদ দিয়ে বিবস্ত্রপ্রায় অবস্থায় টেনে হিঁচড়ে, তার সাথে অত্যন্ত অসম্মানজনক অচরন করতে করতে পাকিস্তানি সেনা ক‍্যাম্পে নিয়ে যায়। লোকজন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখেছে। অনেকে আনন্দ উল্লাস করে সমবেত কন্ঠে, ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’- শ্লোগান দিয়েছে। কেউ প্রতিরোধ করা দূরে থাকুক, প্রতিবাদটুকু পর্যন্ত করে নি। কেন প্রতিবাদ করবে! প্রতিবেশী সম্প্রদায়ের কাছে মা যে ‘মাল এ গনিমত’। যুদ্ধকালে বিধর্মীদের নারী ও সম্পদ ভোগ করা, তাদের ধর্মীয় অধিকার।
কচুরিপানাপূর্ণ পুকুরের মধ্যে থেকে প্রতিবেশীরা আমার শিশু দেহটিকে উদ্ধার করতে না করতেই, আরেক দল স্থানীয় বাংলাভাষী মুসলমান ‘আল্লাহ হু আকবর’- রণধ্বনি দিয়ে আমাদের বাড়িতে ঢুকে যাবতীয় মালামাল লুন্ঠন শেষে- কুঁড়ে ঘরটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। আমরা যাতে না খেতে পেয়ে মারা যাই, এজন্য গাছের সমস্ত অপরিপক্ব ফল পাকড়া নষ্ট করে দেয় এবং পুকুরের জলে বিষ মিশিয়ে দিয়ে সমস্ত মাছ মেরে ফেলে। এরকম সাম্প্রদায়িক আক্রমণ আমাদের বাড়িতেই শুধু নয়, অন‍্য বহু হিন্দু বাড়িতেই করা হয়েছে―বিশেষ করে অবস্থাসম্পন্ন বর্ণ হিন্দুদের বাড়িতে। নিম্নবর্ণের দরিদ্র হিন্দুদের বাড়িতে সাম্প্রদায়িক হামলা তুলনামূলক অনেক কম হলেও, আমাদের বাড়িটিকে টার্গেট করার কারণ ছিল আমার মা― সে দেখতে অনেক সুশ্রী ছিল। এই ভূখণ্ডে সংখ্যালঘু হিন্দু নারীদের দৈহিক সৌন্দর্য- তাদের জন্য খুবই বিপজ্জনক!
আমাদের এলাকায় পাকিস্তানি মিলিটারি ঢুকেছিল ৭ জন। স্থানীয় মুক্তি বাহিনীর সদস্যরা মুখে হাম্বিতাম্বি মেরে হিন্দুদের যথেষ্ট বিভ্রান্ত করেছিল। তার ফলে অনেক হিন্দু ভারতে গিয়ে আপদকালীন আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে, এলাকার মুক্তি বাহিনীর উপর ভরসা করে, নিজ বাড়িতে অবস্থান করছিল। কিন্তু মিলিটারি আসছে শুনে মুক্তিযোদ্ধারা এত ভয় পেয়ে গিয়েছিল যে, তারা হিন্দুদের সামান্যতম সতর্ক সংকেত না দিয়েই, পালিয়ে গিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেয়।
পাকিস্তানের অখণ্ডতাপন্থী স্থানীয় রাজাকারেরা, বাড়ি বাড়ি গিয়ে হিন্দুদের ধরে এনে, একটি বড় মাঠের মধ্যে লাইন দিয়ে দাঁড়া করায়। যাতে পাকিস্তানি সৈন্যরা ব্রাশ ফায়ার করে সহজেই তাদের মেরে ফেলতে পারে। আমাদের এলাকায় আসা পাকিস্তানি সৈন্যদের কমান্ডার ছিল জাতিগত ভাবে একজন বেলুচ। বেলুচরা পাকিস্তানের সুবিধাভোগী পাঞ্জাবীদের দ্বারা নিষ্পেষিত হওয়ায়, তাদের অনেকে নিপীড়িত জাতির প্রতি কিছুটা সহানুভূতিশীল ছিল। আঞ্চলিক মুসলিম লীগ নেতাদের উপর্যুপরি অনুরোধ সত্ত্বেও ঐ বেলুচ কমান্ডার, সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়া করানো হিন্দুদের গুলি করে মারার হুকুম দেয়নি। ধরে আনা হিন্দুরা অর্থের বিনিময়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার অনুমতি পায়। তবে রাজাকারদের প্ররোচনায়, কয়েকজন পাঞ্জাবী ও পাঠান সৈন্য, বিভিন্ন হিন্দু বাড়িতে হানা দিয়ে, সর্বমোট ৯ জন বিশিষ্ট হিন্দুকে হত্যা করে।
আমাদের গ্রাম থেকে মাইল তিনেক দূরে হিন্দু ঘনবসতিপূর্ণ একটি বন্দর এলাকায়, পাকিস্তানি সৈন্যরা অগণিত হিন্দুকে হত্যা করে- একটি প্রশস্ত খালের মধ্যে তাদের মৃতদেহগুলো ফেলে রাখে। এর ফলে, ঐ খালের সাথে সংযুক্ত আমাদের গ্রামের প্রতিটি নালা-ডোবার জল,গণহত্যা কবলিত হিন্দুদের দেহ নিঃসৃত রক্তে বেশ কয়েক দিন রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছিল। এরপর নিহত হিন্দুদের শরীরের পচাগলা মাংসের প্রভাবে, ঐ খালের সাথে সংযুক্ত সমস্ত জলাধার সমূহ – ব‍্যবহারের অনুপযোগী ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে ওঠে।
পাকিস্তানি সৈন্যরা পাশ্ববর্তী অন‍্যান‍্য এলাকার মতো আমাদের এলাকাতেও, কোন মুসলমানকে হত্যা করা দূরে থাকুক, তাদের গায়ে ফুলের টোকাটি পর্যন্ত দেয় নি। বাস্তবতা হচ্ছে, ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যালঘু হিন্দুদের জাতিগতভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে- পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছিল। অন‍্যান‍্য এলাকায় ইসলাম ধর্মাবলম্বী যারা নিহত হয়েছে―তারা ছিল মূলত সম্মুখ সমরের মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের স্বাধীনতাপন্থী সদস্য; এছাড়া তাদের সহযোগী ছাত্র ইউনিয়ন ও রাশিয়াপন্থী কমিউনিষ্ট।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মোট ৩০ লক্ষ মানুষ নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে ২৭ লক্ষ লোক হিন্দু। বাংলাদেশের পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো, মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তারা বলে, মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ লোক নিহত হয় নি; শহীদদের সংখ্যা মাত্র ৩ লাখ। অর্থাৎ তারা নিহত ৩ লাখ মুসলমানকেই শুধু শহীদের মর্যাদা দিতে চায়; বাদবাকি ২৭ লাখ হিন্দুর আত্মত্যাগকে তারা অস্বীকার করে। আসলে তারা হিন্দুদের মানুষ বলেই মনে করে না।
মুক্তিযুদ্ধ শেষে আমার মা আর পাকিস্তানি সেনা ক‍্যাম্প থেকে ফেরত আসে নি। সে জীবিত, না মৃত – কেউ নিশ্চিত ভাবে জানে না। অথচ মাকে নিয়ে জঘন্য সব কল্পকাহিনী প্রচার করে, সমাজের বিকৃত রুচির মানুষেরা দিনের পর দিন আমাদের বিব্রত করেছে, অপমান করেছে।
জ্ঞান হওয়া পরে যে স্মৃতি আমাকে সবচেয়ে বেশী প্রভাবিত করে, তা হচ্ছে: হঠাৎ হঠাৎ বিমাতার বিকট চিৎকারে আতঙ্কিত হয়ে উঠতাম। আমার গর্ভধারিণীর প্রতি অশ্লীল গালি দিয়ে সে বলতো,…”মোরে ভাজা ভাজা হরতে এই জাড়উয়া গুলাইনরে …(জন্ম দিয়ে) রাইখ‍্যা গ‍্যাছে। হাইঙ্গোডা দিন খালি হান্দান আর হান্দান (খাওয়া)। এতো হান্দাইলে রাজার গোলাও হুদা(খালি) হইয়া যাইবে। এতো মাইনষের পোলাপান ঝোলায়(মহামারী) নেয়, এই অজাত গুলাইনরে ঝোলায় চোক্ষে দ‍্যাহে না।…”
‘আজাত গুলাইন’―মানে আমি, আমার সহোদরা দিদি ও সহোদর দাদা। আর কি খাই! তিন বেলার মধ্যে কমপক্ষে একবেলা উপোস; দুপুর বেলা ভাতের সাথে শাক-পাতা সিদ্ধ অথবা ডাল; রাতের বেলা কেবল লবণ-ভাত। মাছ, ডিম ও দুধ বড়ই দূর্লভ। মাংস চিন্তার বাইরে। তবে বিমাতার সন্তানদের জন্য দুধ, ডিম অথবা মাছ ― প্রতিদিন একটা না একটা বরাদ্দ থাকতো। আমরা যদি ভুলেও বৈমাত্রেয় ভাই বোনদের পাতের দিকে তাকাতাম, অমনি শুরু হয়ে যেত বিমাতার বিষাক্ত বাক‍্যবাণ বর্ষণ,”দ‍্যাহো হাবাইত্তার ছাও গুলাইন ক‍্যামনে চাইয়া রইছে, শহুনের চৌখ, নিগ্ঘাত মনুগো প‍্যাডে অসুখ হরবে…”
বিমাতার প্রথম সন্তান অমল, বয়সে আমার থেকে বছর তিনেকের ছোট হলেও, পুষ্টিকর খাবারের প্রভাবে সে ছিল আমার তুলনায় অনেক হৃষ্টপুষ্ট ও বলশালী। আমার প্রতি তার ছিল অকল্পনীয় হিংসা ও বিদ্বেষ। বিরূপ পারিবারিক পরিবেশের কারণে হোক, বা অন্য যে কারণেই হোক, আমি ছিলাম একেবারে নীরিহ ও লাজুক প্রকৃতির। কারো কোন অনিষ্ট করা দূরে থাকুক, নিতান্ত না ঠেকলে কারো সাথে যেচে কথা পর্যন্ত বলতাম না। তা সত্ত্বেও বিমাতা ও বাবা অকারণে আমাকে বিড়াল কুকুরের মতো পিটাতো।
অমলের হাতে যে অসহনীয় মার খেয়েছি, তা আমি কোনদিন ভুলতে পারব না। সে যখন যেখানে সুযোগ পেতো, আমাকে আঘাত করতো। তা হাত দিয়ে পারুক,পা দিয়ে পারুক কিংবা হাতের কাছে আঘাতযোগ্য একটা কিছু পেলেই হলো―কখনো সামনের দিক দিয়ে, কখনো পিছন দিয়ে অলক্ষ্যে আক্রমণ করতো। উহ্ সে কি নির্মম প্রহার! অনাহার অপুষ্টিতে ভোগা আমার শরীর হীনবল; ওকে প্রতিহত করতে পারতাম না। প্রতিঘাতের প্রশ্নই আসে না। দাঁতে দাঁত চেপে মুখ বন্ধ করে মার খেতে হতো। টুঁ-শব্দটি করার কোন উপায় ছিল না। যদি কখনো অসহ্য ব‍্যথায় আমার মুখ দিয়ে কাতরানোর মৃদু একটু শব্দও বের হতো, আর তা বিমাতার কানে পৌঁছাত― তাহলে আর যায় কোথায়! নিজের পুত্রের অপরাধ আড়াল করতে, গর্জে উঠত বিমাতার কন্ঠস্বর,”মারইয়া ফালাইলো রে মারইয়া ফালাইলো ,বেশ‍্যার ছাওডায় মোর পোয়াডারে মারইয়া ফালাইলো …”
আর কর্মক্লান্ত বাবা যদি কাছাকাছি থাকতো, কি জন্য কি ঘটেছে, কে দোষী কে নির্দোষ- তা নিয়ে ভুলেও একবার সে খোঁজ খবব নেওয়া দরকার মনে করতো না। বাবা অমলের প্রতি চরম পক্ষপাতিত্ব করে, আমাকে ঘুষি লাথি মারতে মারতে বলতো, “মরতে পারো না, কুত্তার ছাও গুলাইন, মোর ডোলার চাইল বাঁচপে…”
বিমাতা ছুটে এসে বাবাকে সরিয়ে দিয়ে বলতো,…”তুমি যাও, হাইঙ্গোদিন খাইট্টা পিইট্টা আইছো। এই অজাতটারে মুই মানুষ বানাইতে লাগজি…”
বিমাতার মানুষ বানানোর পদ্ধতি ছিল ভয়ঙ্কর কষ্টদায়ক। সে আমার কঙ্কালসার শরীরের চামড়া ধরে এমন মোচড় দিতো, অভ‍্যন্তরীন রক্তক্ষরণে মোচড়ানো চামড়া দীর্ঘদিন কালো হয়ে থাকতো। সে আমার জুলফির চুল ধরে উল্টো দিকে টান দিতো। প্রচণ্ড ব‍্যথায় দু’চোখ দিয়ে নীরবে জলের ধারা নামতো। ঐ চুল উপড়ে ফেলে রক্ত না বের করা পর্যন্ত, সে ছাড়তো না। যথেচ্ছ যন্ত্রণা প্রদান শেষে সে বীরদর্পে ঘোষণা দিতো,”আইজগো তোর খাওন বন্ধ…।”
এমনিতেই আধপেটা খাবার জুটতো; তার ফলে ক্ষুধা সহ‍্য করার অভ‍্যাস ছিল। যে দিন একেবারেই খাবার দেওয়া হতো না, দিন শেষে মাথা ঘুরাতো। শুয়ে থাকতে বাধ্য হতাম। ভরপেট খেয়ে অমল এসে আমার চুপসে যাওয়া পেটে কষে লাথি মারতো। আমার ছোট্ট শরীর কুঁকড়ে যেতো। পরিতৃপ্ত আহার শেষে বিমাতা পান চিবানোর ফাঁকে, ক্ষয়ে যাওয়া কালো দাঁত বের করে হেসে বলতো,”কি কেমন মজা লাগে…আকাম হরনের কালে মনে আছিলো না…”
বিড়াল মারা লাঠি দিয়ে আমার গায়ে সপাং সপাং বাড়ি দিতে দিতে বাবা বলতো,”এগুলাইনের কোন হায় আবশুষ নাই…”
বিমাতার সংসারে একটি মাতৃহীন শিশু যে রকম বৈষম্যের শিকার হয়ে অবহেলিত-নির্যাতিত। বাংলাদেশ রাষ্ট্রে বিক্ষিপ্ত ভাবে বসবাস করা, অভিভাবকহীন সংখ্যালঘু হিন্দুদের অবস্থা ঠিক ঐ রকমই।
(চলবে)

এই পোস্টটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ ...
© All rights Reserved © 2020
Developed By Engineerbd.net
Engineerbd-Jowfhowo
Translate »