১লা আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ রাত ৩:২৮

বাঙালি সব মাছকেই ’ মাছ ’ বলে শুধু ইলিশ ছাড়া ,সৌভিক রাতুল বসু

রিপোর্টার নাম
  • আপডেট টাইমঃ বৃহস্পতিবার, জুন ১০, ২০২১,
  • 103 সংবাদটি পঠিক হয়েছে

ইলিশের একটা আলাদা গুরুত্ব রয়েছে বাঙালির রসনায় । বাজার থেকে ইলিশ কিনে ফেরার সময়ে কখনও বলে না যে ’ মাছ নিয়ে এলাম ’ বরং বলে ’ ইলিশ নিলাম ’ । আসলে ইলিশ তো বাঙালির কাছে শুধু মাছ নয় , ইলিশ হল ফুটবল , রাজনীতি আর ফিল্মের মতন বাঙালির জীবনের এক অমোঘ সত্য — এক অনন্ত তর্ক । কলকাতা বলে গঙ্গার ( আদতে হুগলি ) ইলিশ হল রাজভোগ । ঢাকা বলে ওপারের ইলিশ জনতার , এপারের ইলিশ দেবতার । কোলাঘাট বলে ইলিশ বুঝতে গেলে রসনার জাত লাগে ওপরদিকে চাঁদপুর পাল্টা বলে এই ইলিশের মানে , দেশদুনিয়া জানে ।

এমনিতে মাছের আলোচনায় বাঙালরা ঘটিদের ধর্তব্যের মধ্যেই আনে না , ব্যাতিক্রম হল শুধু ইলিশ । খাস কলকাতার ঘটিরা বলত ’ দক্ষিণেশ্বর ঘাটে মায়ের রাঙা পায়ের চরণ ধোয়া জল খেয়ে খেয়ে টুকটুকে রুপোলী ইলিশের স্বাদ বোঝা কি বাঙালদের কর্ম ? সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা ছোবল মারে , ’ খাইতেই শেখলা না আবার ইলিশ নিয়ে কথা কও ! হালার যে দেশে ঘরে কুটুম আইলে লোকে কয় , ’ খেয়ে এসেচো না গিয়ে খাবে ’ , তাগো আবার ফাউকানি । ’

তবে এটা বাস্তব যে অধিকাংশ বাঙালি গঙ্গা আর পদ্মার ইলিশের সুক্ষ্ম তফাতটাই বোঝেন না । বুঝতে গেলে একই মরশুমে একই দিনে একই আকারের দু জাতের দুটি ইলিশ কিনে অবিকল একই প্রণালীতে রান্না করে একই পাতে বসে স্বাদগ্রহন করে তুলনা করতে হবে । অন্ততপক্ষে সাতদিন এই প্রক্রিয়া চালিয়ে গেলে তবেই নাকি সামান্য পার্থক্য ধরা যেতে পারে । দমদমের বাজারে আমি স্বচক্ষে দেখেছি গঙ্গা আর পদ্মার ইলিশ পাশাপাশি বিকোতে , এবং দ্বিতীয়টির ঝাঁকি ফাঁকা হয়ে এলে গঙ্গার ইলিশের ঝাঁকি থেকে মাছ তুলে পদ্মারটা ভরে দিতে । বিশ্বাস করুন , সাধারণ চর্মচক্ষে বোঝা দুঃসাধ্য । শুধু মাছের shape দেখে সেটি গঙ্গার না পদ্মার তা একেবারে নির্ভূল বলে দিতে দেখেছিলাম আমাদের স্কুলের বাংলার শিক্ষক প্রয়াত ড: সাধন প্রসাদ বন্দোপাধ্যায়কে । কি জাদুমন্ত্রবলে বলতে পারতেন তা ঈশ্বরই জানেন ।

এরপরে আসছে স্বাদের পার্থক্য । এই পৃথিবীতে যে কোন জীবের মাংসের স্বাদটি নির্ভর করে তার খাদ্যাভাস , খাদ্যের মান এবং সে খাদ্যের পাচন ও বিভাজন কিভাবে হচ্ছে তার ওপর । গঙ্গা অথবা পদ্মা দুইই বঙ্গোপসাগরজাত বলে খাদ্যের উৎস এবং গুনগতমান মূলত এক । সমুদ্রে থাকাকালীন ইলিশ প্রধানত খেয়ে থাকে প্ল্যাঙ্কটন , যার মধ্যে ফাইটো আর জু দুই ধরনেরই থাকে । সাথে থাকে ওয়াটার ফ্লি , বালি আর কাদা । এই খাদ্যাভাসে ইলিশের শরীরে প্রচুর চর্বি আর নির্দিষ্ট গন্ধের জন্ম দেয় । পেটে ডিম এলে ইলিশ যখন উজানি স্রোতে গঙ্গা আর পদ্মার দিকে পাড়ি জমায় , খেলাটা জমে তখন থেকেই । লবন জল ছেড়ে মিষ্টি জলে চলে আসার পর এই পর্যায়ে ইলিশ বলতে গেলে কিছুই মুখে ঠেকায় না — সে বেঁচে থাকে সমুদ্রে থাকাকালীন শরীরে যে চর্বি জমেছিল তার ওপর । সমুদ্র থেকে নদীর অভিমুখে যত সে এগোবে ততই তার শরীরে জমা স্যাচুরেটেড ফ্যাট ভাঙতে ভাঙতে ক্রমে পলি অানস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড বা পুফায় বদলে যাবে । অধিকাংশ মৎস বিজ্ঞানীদের মতে যে তেলের কারনে ইলিশ সুস্বাদু হয় , তা মূলত এই পুফা । যত ইলিশ মিষ্টি জলের দিকে সাঁতরাবে ততই সে মিষ্টি জল গিলতে শুরু করবে যা তার শরীরে এক ধরনের ডায়ালেসিসের কাজ করে সমুদ্রে থাকাকালীন গন্ধ বের করে তাজা ফুলের মত সুরভিত করবে । সমুদ্রের ইলিশের থেকে মোহানার যেখানে জল তুলনামূলকভাবে কম লবনাক্ত সেখানকার ইলিশের স্বাদু বেশী হবে আর নদীর ইলিশ হবে শ্রেষ্ঠ স্বাদযুক্ত । অর্থাৎ ইলিশ সমুদ্র থেকে নদীর উজানে যত বেশী পথ পেরোবে ততই তার স্বাদ বাড়বে । মানে দীঘার ইলিশের থেকে ডায়মন্ডহারবারের ইলিশের স্বাদ ভালো হবে আর কলকাতার কাছাকাছি ধরা ইলিশ হবে একেবারে দেবভোগ্য । এবার বঙ্গোপসাগর থেকে কলকাতার গঙ্গা যদি মোটামুটি ১০০ কিমি হয় , তাহলে চাঁদপুরের পদ্মা হবে কমসে কম দ্বিগুন দূরত্বের । মৎস বিজ্ঞানের স্বাভাবিক নিয়মেই পদ্মার ইলিশ বেশী সুস্বাদু হতে বাধ্য ।

বরং লড়াইটা হতে পারে বাংলাদেশের মধ্যেই । পদ্মাপাড়ের চাঁদপুর আর মেঘনাপাড়ের বরিশালের মধ্যে । চাঁদপুরের মানুষজন বলেন পদ্মার ইলিশ যে সর্বশ্রেষ্ঠ তাতো সারা বিশ্বই মেনে নিয়েছে অতএব তর্ক চলতেই পারে না । বরিশালের বক্তব্য , পদ্মার ইলিশ ! সেতো একটা ব্র্যান্ডিং মাত্র । ইলিশ খেতে গেলে বরিশালে আসতে হবে — ’ চাঁদপুরে তো মাস খাইসেন , এহানে দুগা ইলিশ খ্যায়া যান ।’ এখানে বরিশাল বলতে অবিভক্ত বরিশাল জেলার কথা বলা হয়েছে । বর্তমানে বরিশাল ছটি জেলায় বিভক্ত —- বরিশাল ,বরগুনা, ঝালকাঠি, পিরোজপুর ,পটুয়াখালী আর ভোলা । সম্ভবত কোন একটি আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিনের লেখায় পড়েছিলাম বরিশালের ইলিশ শিকারের রোমাঞ্চকর গল্প আর তার দার্শনিকতা । চন্দ্রমোহনের মাছের আরতে বসে থাকা এক বৃদ্ধ জেলেকে কেউ প্রশ্ন করে ,” আপনি রোজ মাছ পান ? ” এক অবিশ্বাস্য নির্লিপ্ত মুখে বৃদ্ধ জেলে বলেছিলেন ,” কোনদিন আমি পাই ,কোনদিন অন্য কেউ পাইলো , মরশুমে কেউ না কেউ রোজ ঠিকঅই পায় । আল্লাহ সকলের মাপ ঠিক কইরা রাখসেন । ” বছর খানেক আগে যখন জব্বার আলী Sumon Halder বরিশালের ইলিশ কেটেকুটে আমাদের জন্য নিয়ে এলেন , তখনও তার স্বাদ কলকাতার বাজারে বিক্রি হওয়া শ্রেষ্ঠ ইলিশের তুলনায় সাত গুণ ভালো । ইলিশ নিয়ে বরিশাল গুমোর করতে পারে বৈকি ।

আর বরিশাল ‘ লামছড়ি’ গ্রামের জন্যও বিখ্যাত । আরজ আলী মাতুব্বর বিংশ শতাব্দীর এক যুগন্ধর নিরীশ্বরবাদী চিন্তাবিদ । যার লেখালেখিকে বাংলাদেশের যুক্তিবাদী জ্ঞানচর্চার মাইলফলক বলে ধরা হয় । প্রাথমিকের গণ্ডি না পেরোনো স্বশিক্ষিত আরজ আলী বরিশালের এই গ্রামে বসেই লিখেছিলেন তার ‘সত্যের সন্ধানে’,’ অনুমান’, ‘মুক্তমন’ এর মত সময় কাঁপানো সব বই । যদিও তিনি স্বীকৃতি পেয়েছিলেন জীবনের শেষ ধাপে এসে । যে সময়ে , যে প্রত্যন্তে বসে , তীব্র মৌলবাদী ইসলামের বিরুদ্ধে গিয়ে মানুষের ঈশ্বরবিশ্বাস কে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন , তার জন্য বুকের পাটা লাগে বৈকি ।

ভেবে দেখুন একবার । সূর্য মাস্তুল নামাল অনন্ত আড়িয়াল খানের বুকে , জলরাশি পেরিয়ে এক প্রজ্ঞাবান নিরীশ্বরবাদী যুগপুরুষে

এই পোস্টটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ ...
© All rights Reserved © 2020
Developed By Engineerbd.net
Engineerbd-Jowfhowo
Translate »