১লা আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ রাত ৪:১৭

আমাদের ‘বড় কাকু’…

রিপোর্টার নাম
  • আপডেট টাইমঃ মঙ্গলবার, জুন ১৫, ২০২১,
  • 97 সংবাদটি পঠিক হয়েছে

যে মানুষটি পাহাড়সম দারিদ্র্যতার মধ্য দিয়ে পৃথিবীর আলো দেখেছিলেন, সেই মানুষটিই দানবীর খ্যাতি পেয়েছেন!
যে মানুষটি অর্থের অভাবে মা-বাবা-ভাইয়ের চিকিৎসা করাতে পারেননি, আজ তাঁর কারনে শত-শত অসহায় রোগী বিনামূল্যে চিকিৎসা পাচ্ছে।

যে মানুষটি দিন-রাত পরিশ্রম করেও সংসারের অভাব দূর করতে পারছিলেন না, আজ তারই তৈরী প্রতিষ্ঠানসমুহ বাংলাদেশের পাশাপাশি বিশেষ করে কোলকাতা সহ ভারতের অনান্য শহরে তুমুল জনপ্রিয়! তার নামে তৈরী প্রতিষ্ঠানসমুহের সামগ্রী রফতানী হচ্ছে আরও কয়েকটি দেশে।

যিনি শৈশব-কৈশোরে আর্থিক সংকটে শিক্ষার তেমন একটা সুযোগই পাননি, সেই না পাওয়ার অনুভূতি থেকেই শিক্ষার প্রতি জন্মেছে তাঁর গভীর ভালোবাসা। তাই শিক্ষা বিস্তারে তিনি রেখেছেন অতুলনীয় স্বাক্ষর। তাঁর প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

এই ক্ষণজন্মা প্রবাদপুরুষ হলেন মানবপ্রেমিক অমৃত লাল দে; প্রতিষ্ঠান পরিচালনা গুণ, ব্যক্তিত্ব, দরদী মন ও শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রতি সৌভ্রাতৃত্ববোধের জন্য তিনি সকলের ‘অমৃত দা’ বা ‘বড় কাকু’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সব সম্প্রদায়ের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উন্নতিকল্পে অকাতরে দানের মধ্য দিয়ে তিনি লাভ করেছেন অসীম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

অমৃত লাল দে ১৯২৪ সালের ২৭ জুন তৎকালীন ফরিদপুর জেলার আঙ্গারিয়া গ্রামের একটি দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম রাসমোহন দে এবং মা সারদা দেবী। বাবা রাসমোহন ছিলেন সাধারণ কৃষক। অমৃত লাল দে সহ পাঁচ সন্তান ছিল রাসমোহনের। একান্নবর্তী সংসারের ব্যয়ভার বহন করতে হিমশিম খেতে হতো তাঁকে। অর্থাভাবে লেখাপড়াও বন্ধ হয়ে যায় অমৃত লাল দে র। অনেকটা বিনা চিকিৎসায় মারা যান মা। স্বচোখে মায়ের মৃত্যু দেখার পর অমৃত লাল দে’র জীবনে আসে বিরাট পরিবর্তন। ১৯৩৯ সালে ১৫ বছরের কিশোর অমৃত লাল দে দেখেন পরিবারে অভাবের তীব্রতা, অসুস্থ বাবা কাজে যেতে পারতেন না। তাঁর দূরসম্পর্কের ভাই বলরাম বিড়ির কারখানায় কাজ করতেন। তাঁর সহযোগিতায় কার্তিকপুর বাজারে একটি বিড়ির কারখানায় কাজ শুরু করেন অমৃত লাল দে। দিন-রাত পরিশ্রম করেও সংসারের অভাব দূর করতে পারছিলেন না। এমন সময়ে (১৯৪২ সালে) দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। গ্রামে তাঁর বিড়ির কাজ বন্ধ হয়ে গেল। গ্রামে কাজ না থাকায় কাজের সন্ধানে বরিশালে আসেন অমৃত লাল দে।
কালিবাড়ী রোডে জীবন বিড়ি ফ্যাক্টরিতে কাজ নেন। সেখানে প্রতিদিন দুই টাকার মতো আয় হতো। জীবন বিড়ি কারখানার ম্যানেজার সুরেশ বাবু কালিবাড়ী রোডে একটি নতুন দোকান নিলেন। সেই দোকানে ম্যানেজারের পদে অমৃত লাল দে’র চাকরি হলো মাসিক ৬০ টাকা বেতনে। তার সঙ্গে অতিরিক্তভাবে বিড়ি বেঁধে আরো মাসে ৫০-৬০ টাকা আয় করা যেত। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মমতা। অমৃত লাল দে’র সংসারে সচ্ছলতা উঁকি দিতেই জীবন বিড়ির মালিক তাকে ম্যানেজারের পদ থেকে সরিয়ে সেখানে এক নিকটাত্মীয়কে বসালেন। অমৃত লাল দে আবার বিড়ি বাঁধার দায়িত্ব পেলেন।

এরই মধ্যে একটি দোকান নিয়েও অর্থাভাবে তা চালু করতে পারছিলেন না। বন্ধু অনন্ত কুমার দাস কলকাতা থেকে ফিরলেন। দুজনে মিলে ঠিক করলেন পান-বিড়ির দোকান খুলবেন। ১২ টাকা পুঁজি নিয়ে ১৯৪৮ সালে বন্ধু অনন্ত কুমার দাসের সঙ্গে মিলে নিজ হাতে বিড়ি তৈরি করে তা বিক্রি শুরু করেন অমৃত লাল দে। ধীরে ধীরে সেই প্রতিষ্ঠান দক্ষিণ বাংলার অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। নাম তার কারিকর বিড়ি ফ্যাক্টরি!

আর আজ তারই ধারাবাহিকতায় ‘অমৃত ফুড প্রোডাক্ট’ সহ অনান্য প্রতিষ্ঠানসমুহের সামগ্রী বাংলাদেশের পাশাপাশি বিশেষ করে কোলকাতা সহ ভারতের অনান্য শহরে তুমুল জনপ্রিয়!

তাঁর জীবনের মূলমন্ত্র ছিল ‘কর্মই ধর্ম’। বিভিন্ন কর্মসংস্থানমূলক প্রতিষ্ঠান সৃষ্টিসহ সকল সম্প্রদায়ের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উন্নতিকল্পে অকাতর দানের মধ্য দিয়ে সকল সম্প্রদায়ের মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা অর্জন করেছিলেন তিনি। দুঃখী মানুষের অভাব মোচনে তার উদার চিত্তের দান তাঁকে দানবীরের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।

দানবীর, সমাজসেবী, শিক্ষানুরাগী, মানব প্রেমিক অমৃত লাল দে জীবনের অন্তিম অধ্যায়ে ‘অমৃত লাল দে মহাবিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি তাঁর সার্থক সমাপ্তি টানলেন। অমৃত লাল দে মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার এক পর্যায়ে ১৯৯৩ সালের ১৪ জুন (৩০ শে জ্যৈষ্ঠ ১৪০০) ক্ষণজন্মা এই মানুষটি হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ইহলোক ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৯ বছর। অমৃত লাল দে মহাবিদ্যালয় প্রাঙ্গনেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়েছে।

অমৃত লাল দে’র ভাই বিজয় কৃষ্ণ দে বা আমাদের ‘বিজয় কাকু’ সবসময় বলেন-“দাদা দুর্যোগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। তিনিই শিখিয়েছেন দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াতে। অমৃত লাল দের আদর্শ ধারণ করব, যত দিন আমরা আছি।”

বরিশালের শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবক ও দানবীর মহৎপ্রাণ এই প্রবাদপুরুষের ২৮তম মহাপ্রয়াণ দিবসে জানাচ্ছি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।…

আহমেদ রুবাইয়াত ইফতেখার (বাবু)

এই পোস্টটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ ...
© All rights Reserved © 2020
Developed By Engineerbd.net
Engineerbd-Jowfhowo
Translate »